প্রধান খবর

এনসিপির জোট দ্বন্দ্বের ঢেউ লেগেছে নারায়ণগঞ্জে

জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে আসন সমঝোতার মধ্য দিয়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে যাচ্ছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। তবে এ সিদ্ধান্তের গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়লে আপত্তি জানিয়ে এনসিপি দলটির কেন্দ্রীয় ৩০ নেতৃবৃন্দ চিঠি দিয়েছে। সেই তালিকায় এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের কেন্দ্রীয় সংগঠক ও নারায়ণগঞ্জের দায়িত্বে থাকা শওকত আলীর নাম রয়েছে। এছাড়া কেন্দ্রীয় অনেক নেতৃবৃন্দ এনসিপি থেকে পদত্যাগ করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। সেই ক্ষোভের ঢেউ লেগেছে নারায়ণগঞ্জ জেলাতে। এর ধারাবাহিকতায় এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে এনসিপির প্রার্থী আহমেদুর রহমান তনু জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন। এদিকে দলের অনেক নেতাকর্মীর মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। এ নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। 
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের রাজনীতিক দলগুলোর নানা চিন্তা ধারার বাইরে গিয়ে স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত ছিল দলটির নেতাকর্মীদের। যেকারণে দলের নেতাকর্মীরা বিএনপি কিংবা জামায়াতে ইসলামের মত দলগুলোর সাথে অন্তত জোটে যেতে সম্মত ছিলনা। ফলে জামায়াতে ইসলামের সাথে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করার বিষয়টি অনেকে মেনে নিতে পারেনি। যেকারণে এই ক্ষোভের বর্হিপ্রকাশ ঘটেছে। 
জামায়াতে ইসলামের সাথে জোটবদ্ধ হয়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়ে ৩০ জন কেন্দ্রীয় নেতা চিঠি দিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন। সেই তালিকায় রয়েছেন এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের কেন্দ্রীয় সংগঠক শওকত আলী। 
এ বিষয়ে তিনি বলেন, এ বিষয়ে আমরা আপত্তি জানিয়েছি। আমরা স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে চেয়েছি। জামায়াত কিংবা বিএনপি কারও সাথে জোটে গিয়ে নির্বাচন করার বিষয়ে আমাদের সিদ্ধান্ত ছিলনা। তবে দল জামায়াতের সাথে জোট করার আমরা আপত্তি জানিয়েছি।
দল থেকে পদত্যাগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আপাতত এ বিষয়ে কোন সিদ্ধান্ত নেইনি। তবে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিলে পরে জানিয়ে দেওয়া হবে। 
এদিকে এনসিপি জামায়াতে ইসলামের সাথে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করার ঘোষণার পর রবিবার রাতে হঠাৎ করে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের প্রার্থী আহমেদুর রহমান তনু। এ বিষয়ে তিনি বলেন, পারিপার্শ্বিক রাজনৈতিক বাস্তবতা প্রেক্ষাপট ও ব্যক্তিগত বিবেচনায় আমি এনসিপির হয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার ইচ্ছা থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এটি সম্পূর্ণরূপে আমার ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, যার পেছনে কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠীর, বা দলের প্রতি বিরূপ মনোভাব নেই।
দলের হয়ে কাজ করবেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘গত দেড় বছর ধরে আপনারা আমাকে যেভাবে পাশে পেয়েছেন ও কাজ করতে দেখেছেন, আগামীতেও আপনাদের এই সন্তানকে এভাবেই আপনাদের পাশে পাবেন। বর্তমান রাজনৈতিক পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় আমি নির্বাচন থেকে সরে যাচ্ছি, কিন্তু বর্তমান দল থেকে নয়। আগামী আমাদের হবে, ইনশাল্লাহ।
নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে দলীয় প্রার্থী, কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্যসচিব ও জেলা সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট আব্দুল্লাহ আল আমিন বলেন, একটি বড় দল জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নিলে অনেকের ভিন্ন ভিন্ন মত থাকতেই পারে। তবে দল যেটা ভালো মনে করেছে সেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমরা দলের সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানই। আমি দলের মনোনীত প্রার্থী হয়েই নির্বাচন করবো। 
নারায়ণগঞ্জ-১ আসনে এনসিপি থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশী ও জাতীয় যুবশক্তির কেন্দ্রীয় সংগঠক নিরব রায়হান বলেন, আমরা প্রথম থেকে স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে চেয়েছিলাম। তবে নানা দিক বিবেচনা করে দল জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে। সেক্ষেত্রে দলের প্রতি আমার আস্থা আছে। দল যদি আমাকে মনোনয়ন দেয় আমি দলের নির্বাচনে লড়াই করবো। 
নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের মনোনয়ন প্রত্যাশী ও এনসিপির নারায়ণগঞ্জের সমন্বয়ক কমিটির সদস্য জাভেদ আলম বলেন, স্বতন্ত্রভাবে আমাদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার সিদ্ধান্ত ছিল। তবে দল যেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা নানা দিক বিবেচনা করে নিয়েছে। ফলে আমি দলের মার্কা শাপলা কলির পাশাপাশি হ্যা মার্কা নিয়েও নির্বাচন করার বিষয়ে ইচ্ছা পোষণ করছি। 
এখানে উল্লেখ্য যে, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে গত শনিবার বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামীসহ ৮ দলের সঙ্গে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) রাজনৈতিক জোট বা আসন সমঝোতার বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছেন দলটির ৩০ নেত দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে চিঠি দিয়েছিল। চিঠিতে তারা তাদের আপত্তির ভিত্তি হিসেবে এনসিপির ঘোষিত আদর্শ, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান সম্পর্কিত ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা এবং গণতান্ত্রিক নৈতিকতার কথা উল্লেখ করেন।
বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের কেন্দ্রীয় সংগঠক শওকত আলী। 
জামায়াতের সঙ্গে জোটে যাওয়ার বিপক্ষে মত দিয়ে ৩০ সদস্য চিঠিতে উল্লেখ করেন, “রাজনৈতিক ইতিহাস, বিশেষ করে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তাদের স্বাধীনতাবিরোধী ভ‚মিকা, গণহত্যায় সহযোগিতা এবং সে সময় সংঘটিত বিভিন্ন অপরাধ প্রশ্নে জামায়াতের অবস্থান বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক চেতনা ও আমাদের দলের ম‚ল্যবোধের সঙ্গে মৌলিকভাবে সাংঘর্ষিক।”
এতে আরও বলা হয়, “জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর বিগত এক বছরে জামায়াতে ইসলামী ও তাদের ছাত্রসংগঠন ছাত্রশিবিরের বিভাজনম‚লক রাজনৈতিক কর্মকাÐ, অন্যান্য দলের ভেতরে গুপ্তচরবৃত্তি ও স্যাবোটাজ, এনসিপির ওপর বিভিন্ন অপকর্মের দায় চাপানোর অপচেষ্টা, ছাত্র সংসদ নির্বাচনগুলোতে বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদ (বাগছাস) এবং পরবর্তীতে ছাত্রশক্তি বিষয়ে মিথ্যাচার ও অপপ্রচার, অনলাইনে এনসিপি ও আমাদের ছাত্রসংগঠনের নারী সদস্যদের চরিত্র হননের চেষ্টা এবং সর্বোপরি, ধর্মকে কেন্দ্র করে সামাজিক ফ্যাসিবাদের উত্থানের আশঙ্কা দেশের ভবিষ্যতের জন্য অশনিসংকেত হয়ে উঠেছে।”
তাই দলটির সঙ্গে কোনও ধরনের জোট এনসিপির নৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করবে। রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে তারা মনে করেন।
চিঠিতে তারা বলেন, “এর আগে দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী একাধিকবার ৩০০ আসনে প্রার্থী দিয়ে স্বতন্ত্র নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়েছেন। প্রায় দেড় হাজার মনোনয়নপত্র বিক্রি করে ১২৫ জন প্রার্থী ঘোষণা করেছেন। এখন অল্প কিছু আসনের জন্য কোনও জোটে যাওয়া জাতির সঙ্গে প্রতারণা ছাড়া আর কিছু নয়।”
জামায়াতের সঙ্গে কোনও রাজনৈতিক জোটে না যাওয়ার বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান নেওয়ার অনুরোধ জানান এনিসিপির এই নেতারা।
উল্লেখ্য, এনসিপি থেকে পদত্যাগ করে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় ঘোষণা দিয়েছেন এনসিপি’র সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব পদে থাকা ডা. তাসনিম জারা। এ নিয়ে জল কম ঘোলা হয়নি। তবে এসব ঘটনার মধ্যে রবিবার রাতে এনসিপি দলটি জামায়াতে ইসলামীর সাথে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়েছেন।

মতামত দিন

বিজ্ঞপ্তি
সবার আগে সব খবর পেতে ভিজিট করুন - voiceofnarayanganj.com I যে কোন সংবাদ বা বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন - 01963958226 / 01819136738 অথবা মেইল করুন - voiceofnarayanganj24@gmail.com