তিনটি আসনে বিদ্রোহী নিয়ে শঙ্কীত বিএনপি জোট
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ডামাডোল বাঁজতে শুরু করেছে। নারায়ণগঞ্জের পাঁচটি আসনে বিএনপি দলীয় মনোনয়ন পেয়ে চারটি আসনে ধানের শীষের প্রার্থী ও একটি আসনে জোটের প্রার্থী দেওয়া হয়েছে। তবে এর মধ্যে তিনটি আসনে বিএনপি ও জোট দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র হিসেবে বিদ্রোহ করে বিএনপি দলটির নেতৃবৃন্দরা প্রার্থী হয়েছেন। এমনকি এসব বিদ্রোহীদের দল থেকে বহিষ্কার করেও কোন কাজ হচ্ছেনা। তারা বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে মাঠে রীতিমত নিয়মিত প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। এতে করে বিএনপি ও জোট দলের প্রার্থীদের জয়ের পথে নানা কঠিন সমীকরণ তৈরি হয়েছে।
রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় স‚ত্রে জানা যায়, নারায়ণগঞ্জ জেলার পাঁচটি আসনের বিপরীতে মোট ৯৩টি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করা হয়। তবে, শেষদিনে জমা দেন ৫৬ জন। গত শনিবার মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই শেষে ৪০ জনের প্রার্থীতা বৈধ বলে ঘোষণা করেন রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্বপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির। বাতিল হন ১৬ জন।
নারায়ণগঞ্জের পাঁচটি আসনের মধ্যে চারটিতে দলীয় প্রার্থী দিয়েছে বিএনপি। এবং একটি আসন জোটের শরিক দলকে ছেড়ে দিয়েছে। কিন্তু ঘোষিত এই পাঁচ প্রার্থীর বাইরেও বেশ কয়েকজন বিএনপি নেতা প্রার্থী হয়েছেন। তারা দল থেকে মনোনয়ন না পেয়ে কেউ স্বতন্ত্র হয়েছেন, কেউবা ভিন্ন দল থেকে নির্বাচনী মাঠে আছেন।
বিএনপির দলীয় প্রার্থীরা হলেন: নারায়ণগঞ্জ-১ (রূপগঞ্জ) মুস্তাফিজুর রহমান ভ‚ঁইয়া দিপু, নারায়ণগঞ্জ-২ (আড়াইহাজার) নজরুল ইসলাম আজাদ, নারায়ণগঞ্জ-৩ (সোনারগাঁ ও সিদ্ধিরগঞ্জ) আজহারুল ইসলাম মান্নান ও নারায়ণগঞ্জ-৫ (সদর-বন্দর) অ্যাডভোকেট আবুল কালাম। এছাড়া, নারায়ণগঞ্জ-৪ (ফতুল্লা) আসনে শরিক দল জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের প্রার্থী মুফতি মনির হোসেন কাসেমী বিএনপি-জোটের প্রার্থী।
এদিকে, মনোনয়ন বঞ্চিত হয়ে নির্বাচনে দাঁড়িয়েছেন বিএনপির চার প্রভাবশালী নেতা- আতাউর রহমান আঙ্গুর, মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন, মোহাম্মাদ আলী ও মো. শাহ আলম। তাদের মধ্যে শাহ আলম ছাড়া বাকি তিনজনই ছিলেন বিএনপির সংসদ সদস্য।
এদের মধ্যে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে নির্বাচনী মাঠে থাকায় গিয়াস উদ্দিন এবং শাহ আলমকে বহিষ্কার করেছে বিএনপি। তারা দু‘জনই দলের নির্বাহী কমিটির সদস্য ছিলেন।
গিয়াস, মোহাম্মদ আলী ও শাহ আলম তিনজনই নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে প্রার্থী হয়েছেন, তবে আঙ্গুর নারায়ণগঞ্জ-২ আসনে প্রার্থী হয়েছেন। চারজনের মধ্যে তিনজন স্বতন্ত্র প্রার্থী হলেও মোহাম্মদ আলী বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টি থেকে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন।
বিএনপি ছাড়াও জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি সহ ১১ দলীয় জোট থেকে প্রত্যেকটি আসনে প্রার্থী দেওয়া হয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরা হলেন: নারায়ণগঞ্জ-১ (রূপগঞ্জ) আনোয়ার হোসেন মোল্লা, নারায়ণগঞ্জ-২ (আড়াইহাজার) মো. ইলিয়াস মোল্লা, নারায়ণগঞ্জ-৩ (সোনারগাঁ ও সিদ্ধিরগঞ্জ) ইকবাল হোসেন ভূঁইয়া।
জামায়াতে ইসলামীর সাথে জোট দল হিসেবে রয়েছে খেলাফতে মজলিস। খেলাফত মজলিসের প্রার্থীরা হলেন: নারায়ণগঞ্জ-৪ (ফতুল্লা) ইলিয়াস আহমেদ, নারায়ণগঞ্জ-৫ (সদর-বন্দর) এবিএম সিরাজুল মামুন।
জোট দলে আরও রয়েছে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস। তাদের প্রার্থীরা হলেন: নারায়ণগঞ্জ-১ (রূপগঞ্জ) আ. কাইয়ুম শিকদার, নারায়ণগঞ্জ-২ (আড়াইহাজার) মো. আবুল কালাম, নারায়ণগঞ্জ-৩ (সোনারগাঁ ও সিদ্ধিরগঞ্জ) মো. শাহজাহান, নারায়ণগঞ্জ-৪ (ফতুল্লা) আনোয়ার হোসেন।
এছাড়া জোটের আরেক শরীক দল এনসিপি থেকে একটি আসনে প্রার্থী দেওয়া হয়েছে। নারয়ণগঞ্জ-৪ আসনে জাতীয় নাগরিক পার্টির অ্যাডভোকেট আব্দুল্লাহ আল আমিনকে প্রার্থী দেওয়া হয়েছে।
তবে ইসলামী আন্দোলনের সাথে এই ১১ দলের জোট হওয়া নিয়ে নানা জটিলতা তৈরি হয়েছে। শেষ পর্যন্ত তারা জোটে যাবে কিনা তা নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। ইসলামী আন্দোলনের মনোনীত প্রার্থীরা হলেন: নারায়ণগঞ্জ-১ (রূপগঞ্জ) মো. ইমদাদুল্লাহ, নারায়ণগঞ্জ-৩ (সোনারগাঁ ও সিদ্ধিরগঞ্জ) গোলাম মসীহ্, নারায়ণগঞ্জ-৪ (ফতুল্লা) মুফতি ইসমাইল কাউসার ও নারায়ণগঞ্জ-৫ (সদর-বন্দর) মুফতি মাছুম বিল্লাহ।
তবে জেলার এই পাঁচটি আসনের মধ্যে নারায়ণগঞ্জ-১ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান দিপু ভূইয়ার প্রতিদ্ব›দ্বী হিসেবে যুবদল নেতা দুলাল মনোনয়ন পত্র জমা দিলেও শেষতক তার মনোনয়ন বাতিল হয়েছে। ফলে সেই আসনে বিদ্রোহী নিয়ে কোন শঙ্কা নেই। এছাড়া নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের ধানের শীষের প্রার্থী আবুল কালামের বিপরীতে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাকসুদ হোসেন মনোনয়ন পত্র দাখিল করেছিলেন। কিন্তু তার মনোনয়ন বাতিল হয়েছে। যদিও তিনি বিএনপি দলের রাজনীতির সাথে জড়িত নয়, তবে ভোটের মাঠে এই প্রার্থী অংশগ্রহণ করলে সমীকরণ বেশ কঠিন হয়ে পড়তো। তাছাড়া এই আসনের জামায়াতে ইসলাম দলটি তাদের প্রার্থী প্রত্যাহার করে নিয়েছে। জোট দলের প্রার্থী খেলাফতে ইসলামের সিরাজুল মামুনকে দেওয়া হয়েছে। ফলে এই আসনের তিনি বেশ স্বস্তিতে রয়েছে।
অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে বিএনপি দলীয় জোটের প্রার্থী জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মুফতি মনির হোসাইন কাসেমীর প্রতিদ্ব›দ্বী হিসেবে মাঠে রয়েছে তিন হেভিওয়েট নেতা। তারা হলেন- শাহ আলম, মোহাম্মদ আলী ও মোহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন। গিয়াস উদ্দিন দুটি আসন থেকে মনোনয়ন পত্র জমা দিয়ে বৈধতা পেয়েছেন। ফলে এই আসনে জমিয়তের প্রার্থীকে বেশ ঘাম ঝড়াতে হবে। বিএনপি দলটির অনেক নেতাকর্মী বহিষ্কার ঠেকাতে জোটের প্রার্থীর সাথে কাজ করলেও ভেতরে ভেতরে অনেকে পছন্দমত বিদ্রোহীদের জন্য কাজ করছে। ফলে এই আসনে জোটের প্রার্থী এখনো ডেডলাইনে অবস্থান করছেন।
নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে বিএনপি প্রার্থী আজহারুল ইসলাম মান্নানের বিপরীতে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি গিয়াস উদ্দিন রয়েছে। এছাড়া সাবেক প্রতিমন্ত্রী রেজাউল করিম মনোনয়ন পত্র জমা দিলেও তার মনোনয়ন বাতিল হয়েছে। যদিও এখন পর্যন্ত আপিল করার সময় রয়েছে। যদি শেষতক আপিলে তার মনোনয়ন টিকে যায় তাহলে তিনি প্রার্থী হবেন। অন্যদিকে গিয়াস উদ্দিন ঘোষণা দিয়েছেন এই আসনে রেজাউল করিম প্রার্থী হলে তিনি এখানে প্রার্থী হবেন না। তার অর্থ হলো, এই আসনে গিয়াস উদ্দিন ও রেজাউল করিমের মধ্যে যে কোন একজন প্রার্থী হবে। সে হিসেবে ভোটের মাঠে বিদ্রোহীদেও নিয়ে বেশ কঠিন সমীকরণ তৈরি হবে।
নারায়ণগঞ্জ-২ আসনে বিএনপি প্রার্থী নজরুল ইসলাম আজাদের প্রতিদ্ব›দ্বী হিসেবে মাঠে রয়েছে সাবেক সংসদ সদস্য আতাউর রহমান খান আঙ্গুর। বিএনপি দলের প্রার্থীর বিরুদ্ধে গিয়ে তিনি এখনো বহিষ্কার হননি। ফলে তিনি বেশ ফুরফুরে মেজাজে রয়েছে। আর এই বিষয়টি স্থানীয় রাজনীতিকদের ভাবাচ্ছে। যদিও শোন যাচ্ছে, আজাদ বিএনপি প্রার্থী হওয়ায় বিএনপির বিরোধী বলয়ের নেতাকর্মীরা অনেকে আজাদ বলয়ে ভিড়েছেন। সে হিসেবে আজাদ বলয় অনেকটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়ছে।
ফলে নির্বাচনে ভোটের লড়াইয়ে এই তিনটি আসনে বেশ কঠিন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। বিএনপি ঠেকাতে নানা ছক কসছে বিদ্রোহী ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। আর সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে জামায়াতে ইসলামী ও তাদের জোটের প্রার্থীরা বিজয়ী হতে চাইছেন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
মতামত দিন