অস্ত্র উদ্ধারেও কাটেনি শঙ্কা, বাড়ছে উদ্বেগ
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্র সহ বিভিন্ন ঘটনার সময় অবৈধভাবে ব্যবহৃত অস্ত্র নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। জনমনে নানা উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। কারণ জুলাই বিপ্লবের সময় নারায়ণগঞ্জ জেলার বেশ কয়েকটি থানা লুট করে অস্ত্র নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। সেই অস্ত্রের মধ্যে এখনো অনেক অস্ত্র উদ্ধার হয়নি। এর মধ্যে পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে অস্ত্র উদ্ধারে পুরষ্কার ঘোষণা করা হলেও এখনো অনেক অস্ত্র উদ্ধার হয়নি। এছাড়া নুন থেকে চুন খসলেই জেলার বিভিন্ন প্রান্তে প্রকাশ্যে দ্ব›দ্ব ও অস্ত্র নিয়ে হামলার ঘটনা অহরহ দেখা যাচ্ছে। এতে করে জনমনে আতঙ্ক দেখা দিচ্ছে। তার উপরে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটের দিন যত ঘনিয়ে আসছে জনমনে উদ্বগ ও উৎকণ্ঠা তত বাড়ছে। সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে বিএনপি দলীয় মনোনীত প্রার্থী মাসুদুজাম্মান মাসুদ নিরাপত্তাজতির কারণে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ায়। এর মধ্যে সম্প্রতি পুলিশ প্রশাসন বেশ কিছু অভিযান পরিচালনা করলে দেশিয় অস্ত্র ও আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করেছে। তবুও জনমনে শঙ্কা কাটছেনা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্র ও অপরাধীনের হাতে ব্যবহৃত অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার না হলে তা নিয়ে শঙ্কা কাটবেনা।
জেলা পুলিশ স‚ত্র জানা যায়, গত বছরের ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের সময় পুলিশ লাইনস, সিদ্ধিরগঞ্জ থানা, আড়াইহাজার থানা এবং গোপালদী ও কালাপাহাড়িয়া তদন্ত কেন্দ্রে ব্যাপক হামলা ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। এ সময় মোট ১৫১টি অস্ত্র ও ৯ হাজার ২৫ রাউন্ড গুলি লুট হয়। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত উদ্ধার হয়েছে ১১০টি অস্ত্র এবং ১ হাজার ৫০৭ রাউন্ড গুলি। এখনও নিখোঁজ রয়েছে ৪০টি অস্ত্র ও ৭ হাজার ৩৯৫ রাউন্ড গুলি।
সবচেয়ে বেশি অস্ত্র লুট হয় আড়াইহাজারের দুটি তদন্ত কেন্দ্র থেকেÑ ১৩৭টি অস্ত্র ও ৬ হাজার ১১৯ রাউন্ড গুলি। এখনও নিখোঁজ আছে ২৯টি অস্ত্র ও ৪ হাজার ৮০০ রাউন্ড গুলি। এর মধ্যে রয়েছে চায়নায় নির্মিত রাইফেল, এসএমজি, পিস্তল, শর্টগান এবং গ্যাসগান। সিদ্ধিরগঞ্জ থানার লুট হওয়া পাঁচটি অস্ত্রের মধ্যে উদ্ধার হয়েছে দুটি। জেলা পুলিশ লাইনস থেকে লুট হওয়া ৯টি অস্ত্রের একটিও উদ্ধার হয়নি। কর্তৃপক্ষের কাছে এ মুহ‚র্তে এসব অস্ত্র কারা ব্যবহার করছে, তাও অজানা। তবে খোঁয়া যাওয়া এসব অস্ত্র কেউ ব্যবহার করলে তা অবৈধ বলে গন্য হবে বলে জানা গেছে।
নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট থেকে লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধারে সহযোগিতা চেয়ে জনগণের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। এসব অস্ত্র ও গোলাবারুদের প্রকৃত সন্ধানদাতাদের ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত দেওয়া হবে বলে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয় থেকে জানানো হয়েছে। গত ১০ নভেম্বর দুপুরে নারায়ণগঞ্জ জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও অপারেশন) তারেক আল মেহেদী এ তথ্য জানিয়েছিলেন।
পুরস্কারের পরিমাণ জানিয়ে তিনি বলেন, প্রতি গুলি উদ্ধারে ৫০০ টাকা, প্রতি পিস পিস্তল ও শর্টগান উদ্ধারে ৫০ হাজার টাকা, প্রতি পিস রাইফেল উদ্ধারে ১ লাখ টাকা টাকা, এসএমজি উদ্ধারে দেড় লাখ টাকা এবং এলএমজি উদ্ধারে ৫ লাখ টাকা দেওয়া হবে।
এদিকে গত বছরের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর থেকে সহিংসতার ঘটনা বেড়ে চলেছে। এতে প্রাণহানি ও হতাহতের ঘটনা ঘটেছে।
অস্ত্র প্রদর্শনের নানা ঘটনা স‚ত্রে জানা গেছে, গত ১৯ মার্চ নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দু’পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ ও গোলাগুলিতে হাসিব নামে এক যুবদলের কর্মী গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত সহ ৩০ জন আহত হয়েছেন। গত ৬ মার্চ নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে ঝুট ব্যবসাকে কেন্দ্র করে বিএনপির দুই গ্রুপের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ ও গুলিবর্ষণে ১০ জন আহত হয়েছেন। গত ৭ ফেব্রুয়ারী নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম-আহ্বায়ক মামুন হোসাইনকে (৪২) গুলি করে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। গত ১ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় প‚র্ব বিরোধের জেরে মো. পায়েল নামের এক যুবককে গুলি করে হত্যা করে প্রতিপক্ষের লোকজন। গত বছরের ১ ডিসেম্বর রাতে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে দৈনিক কালবেলার সাংবাদিক জাহাঙ্গীর মাহমুদের বাড়িতে একদল সন্ত্রাসী হোন্ডা দিয়ে মহড়া দিয়ে গুলি ছুড়ে। গত ২২ সেপ্টেম্বর ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে চলচালকারী বন্ধন বাসের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিএনপির দুই পক্ষ সংঘর্ষে জড়িয়ে ১০ জন আহত হন। এ সময় রাসেল নামের এক ব্যক্তি পিস্তল হাতে প্রকাশ্যে ভয়ভীতি দেখিয়েছে।
তাছাড়া অবৈধ অস্ত্র ও গুলি সহ প্রায় সময় সন্ত্রাসী ও অপরাধীরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জালে ধরা পড়ছে। গত ৮ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জের বন্দরে পরিত্যাক্ত অবস্থায় ম্যাগাজিনসহ একটি বিদেশি পিস্তল, গত ৮ মার্চ নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে অস্ত্র কেনাবেচার সময় দুটি বিদেশি পিস্তল, দুটি ম্যাগজিন ও আট রাউন্ড গুলি সহ দুজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গত ৩ মার্চ নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় দুই রাউন্ড গুলি ও পিস্তল সহ দুই সহোদরকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এভাবে বিভিন্ন সময় অবৈধ অস্ত্র সহ অপরাধীদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ফলে অবৈধ অস্ত্রের ছড়াছড়ি দেখে জনমনে আতঙ্ক ক্রমশ বাড়ছে।
এদিকে নির্বাচনে আগে পুলিশ প্রশাসন দফায় দফায় অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন। সেই অভিযানে গত ৬ জানুয়ারী নারায়ণগঞ্জ শহরের গলাচিপায় মাদক ও বিপুল পরিমাণ দেশীয় অস্ত্র সহ ফাইটার মনির নামে এক মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
এ ঘটনায় ফতুল্লা মডেল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) গাজী শামীম বলেন, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনা করে ফাইটার মনিরকে আটক করলে তার দেয়া তথ্যে তল্লাশি চালিয়ে মাদক ও বিপুল পরিমাণ দেশীয় অস্ত্র, সিসি ক্যামেরা, কম্পিউটার জব্দ করা হয়। মনির দীর্ঘদিন যাবত এলাকায় মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি, ছিনতাই সহ বিভিন্ন অপরাধের সাথে জড়িত। তার বিরুদ্ধে থানায় একাধিক অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
এর আগে, গত ৫ জানুয়ারী ফতুল্লা থানাধীন দরগা বাড়ি মসজিদ রোড এলাকায় অভিযান চালিয়ে ২২২ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট, একটি পিস্তল ও দুই রাউন্ড ম্যাগাজিনসহ এক মাদক কারবারীকে গ্রেপ্তার করেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। গ্রেপ্তারকৃত আসামির নাম মোহাম্মদ শরীফ হোসেন (৩৩)। তিনি ফতুল্লার দরগা বাড়ি মসজিদ রোড এলাকার শাহাবুদ্দিন মিয়ার ছেলে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানায়, শরীফ হোসেন একজন চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী এবং তার বিরুদ্ধে একাধিক মাদক ও অস্ত্র মামলার তথ্য রয়েছে। অভিযানের সময় তার কাছ থেকে একটি দা ও একটি কুড়ালও উদ্ধার করা হয়।
পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্র ও অবৈধ অস্ত্র নিয়ে জনমনে শঙ্কা তৈরি হয়েছে উল্লেখ করে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) নারায়ণগঞ্জ জেলার সভাপতি ধীমান সাহা জুয়েল বলেন, এসব অস্ত্র ও গোলাবারুদ লুট হওয়া অনুচিত ছিল। পরবর্তী সরকার এসব অস্ত্র উদ্ধারে কঠোর ভ‚মিকা পালন করা উচিত ছিল, তেমনটি আমরা দেখিনি। ফলে এসব অস্ত্র ভুল লোকের হাতে চলে গেলে ভয়ংকর ঘটনা ঘটতে পারে। এরুপ কারণে জনগণ খুব আতঙ্কিত। এছাড়া বিভিন্ন সংঘর্ষ ও সহিংসতার ঘটনায় অবৈধ অস্ত্র প্রদর্শনের মত ঘটনা আমরা মনিটরিং করেছি। ফলে অস্ত্রগুলো উদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত জনমনে স্বস্তি ফিরে আসবেনা।
পুলিশ বলছে, অস্ত্র উদ্ধারে আমাদের অভিযান চলমান রয়েছে। নির্বাচনের আগে বাকী অস্ত্র উদ্ধারে জেলা, থানা, গোয়েন্দা বিভাগসহ সকলে সচেষ্ট রয়েছে।
তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে নিরাপত্তা ইস্যু নিয়ে নানা মহলে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রার্থী হাদি হত্যার ঘটনার পর থেকে অস্ত্র উদ্ধারের বিষয়টি আরও গুরুত্ব পেয়েছ। ফলে পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্রের পাশাপাশি অপরাধীদের কাছে থাকা অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের তৎপড়তা দেখতে চায় জনগণ।
মতামত দিন