প্রধান খবর

একাধিক অভিযানে বিপুল পরিমাণে অস্ত্র উদ্ধার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অ্যাকশন শুরু

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অ্যাকশন শুরু হয়েছে। শহর ও শহরতলীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হচ্ছে। এসব অভিযানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়ছে সন্ত্রাসীরা। উদ্ধার হওয়া এসব অস্ত্রের মধ্যে পুলিশের খোয়া যাওয়া অস্ত্র রয়েছে। ফলে জনমনে ও নির্বাচনের প্রার্থীদের মধ্যেও এক ধরনের আতঙ্ক বিরাজ করছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আগে শত শত অবৈধ দেশিও ও আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার হচ্ছে। যা এতোদিন অপরাধীদের হাতে ছিল। নির্বাচন সহ বিভিন্ন সময়ে এসব অপরাধীদের হাতে বড় ধরনের অঘটন ঘটে যেতে পারে। ফলে অতি দ্রæত তাদের গ্রেফতার করা সম্ভব না হলে বিপদ আসন্ন বলে মনে করছেন সচেতন মহল। 
জানা গেছে, গত ৯ জানুয়ারি আড়াইহাজারে বিশেষ অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করেছে যৌথ বাহিনী। এ ঘটনায় ৫ জনকে আটক করা হয়েছে। 
অভিযানে উদ্ধার করা অস্ত্র ও সরঞ্জামের মধ্যে রয়েছে- পুলিশের খোয়া যাওয়া একটি পিস্তল ও ম্যাগাজিন, ১০ রাউন্ড গুলি, পাঁচটি শটগানের কার্তুজ, আটটি ককটেল, ৩৮৮টি রামদা, সাতটি চাপাতি, একটি বড় ছোরা, ছয়টি ছোট ছোরা, ১৩টি দা, দুটি কুড়াল, ছয়টি হকিস্টিক, টেটা, ডাকাতির কাজে ব্যবহৃত বড় টর্চলাইট, একটি ইলেকট্রিক শক দেওয়ার যন্ত্র এবং নগদ ১০ লাখ ১৫ হাজার ৮০০ টাকা।
আটককৃত পাঁচজন হলেন মোহাম্মদ স্বপন, পারভেজ, মতিন, জাকির ও রিংকু মিয়া।
পুলিশ সূত্রে ও স্থানীয় স‚ত্রে জানা গেছে, ভোর থেকে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে পরিচালিত এই অভিযানে কালাপাহাড়িয়া ইউনিয়নের খালিয়ারচর, মধ্যারচর ও কদমীরচর সহ একাধিক এলাকা ঘিরে ফেলা হয়। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে যৌথ বাহিনীর সদস্যরা বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে সন্দেহভাজন সন্ত্রাসীদের বাড়িতে তল্লাশি চালানো হয়। এ সময় পুলিশের খোয়া যাওয়া একটি আগ্নেয়াস্ত্র, বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ ও দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র উদ্ধার করা হয়। একই সঙ্গে পাঁচজন চিহ্নিত সন্ত্রাসীকে হাতেনাতে আটক করা হয়েছে।
অভিযান শেষে কালাপাহাড়িয়ার খালিয়ারচর জাহানারা বেগম উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে এক সংবাদ সম্মেলনে সেনাবাহিনীর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল যোবায়ের আলম বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নিবার্চনকে সামনে রেখে সন্ত্রাসের জনপদ খ্যাত কালাপাহাড়িয়া ইউনিয়নে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে যৌথ বাহিনী বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে। ভোর থেকে সেনাবাহিনীর ১৪০ জন সদস্য ও থানা পুলিশের দশজন সদস্যকে সাথে নিয়ে যৌথবাহিনী বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে। এ সময় গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এলাকর চিহ্নিত সন্ত্রাসী ডাকাত ও অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী, চাদাঁবাজদের বাড়িতে বাড়িতে তল্লাশি অভিযান চালিয়ে পুলিশের খোয়া যাওয়া একটি পিস্তল, পাঁচ রাউন্ড গুলি সহ বিপুল পরিমাণ দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র উদ্ধার করা হয়। 
বিষয়টি নিশ্চিত করে নারায়ণগঞ্জের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (‘গ’ সার্কেল) মেহেদী ইসলাম বলেন, কালাপাহাড়িয়ার কদমীরচর এলাকার কাশেম আলীর পরিত্যক্ত বাড়ি থেকে ম‚লত অস্ত্রগুলো উদ্ধার করা হয়। আর কাশেম আলীর ছেলে উপজেলা ছাত্রদলের সদস্য সচিব মোবারক হোসেন। এ ঘটনায় আটক ৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এছাড়া বাকি আটকদের মধ্যে কেউ ছাত্রদলের রাজনীতির সাথে জড়িত নেই বলে আমরা জানতে পেরেছি।
এর আগে, ৮ জানুয়ারি দিবাগত রাত আনুমানিক ১টা ১০ মিনিটে রূপগঞ্জ থানাধীন তারাবো পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কর্নগোপ এলাকায় যৌথ অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানে ইসমাইল ভ‚ঁইয়া ও আবু সাইদের বসতবাড়ি থেকে তাদের গ্রেফতার করা হয়।
গ্রেফতাররা হলেন মো. ফাহিম ভ‚ঁইয়া (৩৫), ন‚রে মোহাম্মদ (১৮), খোকন মিয়া (৫৫), নাহিদ (১৮), মো. জোবায়ের (২৪), এসএম তৌহিদুজ্জামান (২১)। গ্রেফতারকৃত সবাই কর্নগোপ এলাকার বাসিন্দা এবং তারাবো পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তর্ভুক্ত।
অভিযানে তাদের হেফাজত থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, পিস্তলের ৫ রাউন্ড গুলি, একটি কাটা রাইফেল, রাইফেলের ২ রাউন্ড গুলি, ২টি চাপাতি, ৩৬০ গ্রাম গাঁজা, ৫টি মোবাইল ফোন ও নগদ ২১ হাজার ৯২০ টাকা উদ্ধার করা হয়।
পুলিশ জানায়, গ্রেফতাররা সংঘবদ্ধ একটি অপরাধী চক্রের সদস্য। তাদের বিরুদ্ধে রূপগঞ্জ থানায় অস্ত্র আইন ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা দায়ের করা হয়েছে।

এদিকে নির্বাচনে আগে পুলিশ প্রশাসন দফায় দফায় অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন। সেই অভিযানে গত ৬ জানুয়ারী নারায়ণগঞ্জ শহরের গলাচিপায় মাদক ও বিপুল পরিমাণ দেশীয় অস্ত্র সহ ফাইটার মনির নামে এক মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। 
এ ঘটনায় ফতুল্লা মডেল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) গাজী শামীম বলেন, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনা করে ফাইটার মনিরকে আটক করলে তার দেয়া তথ্যে তল্লাশি চালিয়ে মাদক ও বিপুল পরিমাণ দেশীয় অস্ত্র, সিসি ক্যামেরা, কম্পিউটার জব্দ করা হয়। মনির দীর্ঘদিন যাবত এলাকায় মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি, ছিনতাই সহ বিভিন্ন অপরাধের সাথে জড়িত। তার বিরুদ্ধে থানায় একাধিক অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
এর আগে, গত ৫ জানুয়ারী ফতুল্লা থানাধীন দরগা বাড়ি মসজিদ রোড এলাকায় অভিযান চালিয়ে ২২২ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট, একটি পিস্তল ও দুই রাউন্ড ম্যাগাজিনসহ এক মাদক কারবারীকে গ্রেপ্তার করেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। গ্রেপ্তারকৃত আসামির নাম মোহাম্মদ শরীফ হোসেন (৩৩)। তিনি ফতুল্লার দরগা বাড়ি মসজিদ রোড এলাকার শাহাবুদ্দিন মিয়ার ছেলে।
জেলা পুলিশ স‚ত্র জানা যায়, গত বছরের ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের সময় পুলিশ লাইনস, সিদ্ধিরগঞ্জ থানা, আড়াইহাজার থানা এবং গোপালদী ও কালাপাহাড়িয়া তদন্ত কেন্দ্রে ব্যাপক হামলা ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। এ সময় মোট ১৫১টি অস্ত্র ও ৯ হাজার ২৫ রাউন্ড গুলি লুট হয়। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত উদ্ধার হয়েছে ১১০টি অস্ত্র এবং ১ হাজার ৫০৭ রাউন্ড গুলি। এখনও নিখোঁজ রয়েছে ৪০টি অস্ত্র ও ৭ হাজার ৩৯৫ রাউন্ড গুলি।
সবচেয়ে বেশি অস্ত্র লুট হয় আড়াইহাজারের দুটি তদন্ত কেন্দ্র থেকেÑ ১৩৭টি অস্ত্র ও ৬ হাজার ১১৯ রাউন্ড গুলি। এখনও নিখোঁজ আছে ২৯টি অস্ত্র ও ৪ হাজার ৮০০ রাউন্ড গুলি। এর মধ্যে রয়েছে চায়নায় নির্মিত রাইফেল, এসএমজি, পিস্তল, শর্টগান এবং গ্যাসগান। সিদ্ধিরগঞ্জ থানার লুট হওয়া পাঁচটি অস্ত্রের মধ্যে উদ্ধার হয়েছে দুটি। জেলা পুলিশ লাইনস থেকে লুট হওয়া ৯টি অস্ত্রের একটিও উদ্ধার হয়নি। কর্তৃপক্ষের কাছে এ মুহ‚র্তে এসব অস্ত্র কারা ব্যবহার করছে, তাও অজানা। তবে খোঁয়া যাওয়া এসব অস্ত্র কেউ ব্যবহার করলে তা অবৈধ বলে গন্য হবে বলে জানা গেছে। 
নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট থেকে লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধারে সহযোগিতা চেয়ে জনগণের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। এসব অস্ত্র ও গোলাবারুদের প্রকৃত সন্ধানদাতাদের ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত দেওয়া হবে বলে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয় থেকে জানানো হয়েছে। গত ১০ নভেম্বর দুপুরে নারায়ণগঞ্জ জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও অপারেশন) তারেক আল মেহেদী এ তথ্য জানিয়েছিলেন।
পুরস্কারের পরিমাণ জানিয়ে তিনি বলেন, প্রতি গুলি উদ্ধারে ৫০০ টাকা, প্রতি পিস পিস্তল ও শর্টগান উদ্ধারে ৫০ হাজার টাকা, প্রতি পিস রাইফেল উদ্ধারে ১ লাখ টাকা টাকা, এসএমজি উদ্ধারে দেড় লাখ টাকা এবং এলএমজি উদ্ধারে ৫ লাখ টাকা দেওয়া হবে।
এদিকে গত বছরের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর থেকে সহিংসতার ঘটনা বেড়ে চলেছে। এতে প্রাণহানি ও হতাহতের ঘটনা ঘটেছে।
অস্ত্র প্রদর্শনের নানা ঘটনা স‚ত্রে জানা গেছে, গত ১৯ মার্চ নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দু’পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ ও গোলাগুলিতে হাসিব নামে এক যুবদলের কর্মী গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত সহ ৩০ জন আহত হয়েছেন। গত ৬ মার্চ নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে ঝুট ব্যবসাকে কেন্দ্র করে বিএনপির দুই গ্রুপের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ ও গুলিবর্ষণে ১০ জন আহত হয়েছেন। গত ৭ ফেব্রুয়ারী নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম-আহ্বায়ক মামুন হোসাইনকে (৪২) গুলি করে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। গত ১ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় প‚র্ব বিরোধের জেরে মো. পায়েল নামের এক যুবককে গুলি করে হত্যা করে প্রতিপক্ষের লোকজন। গত বছরের ১ ডিসেম্বর রাতে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে দৈনিক কালবেলার সাংবাদিক জাহাঙ্গীর মাহমুদের বাড়িতে একদল সন্ত্রাসী হোন্ডা দিয়ে মহড়া দিয়ে গুলি ছুড়ে। গত ২২ সেপ্টেম্বর ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে চলচালকারী বন্ধন বাসের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিএনপির দুই পক্ষ সংঘর্ষে জড়িয়ে ১০ জন আহত হন। এ সময় রাসেল নামের এক ব্যক্তি পিস্তল হাতে প্রকাশ্যে ভয়ভীতি দেখিয়েছে।
তাছাড়া অবৈধ অস্ত্র ও গুলি সহ প্রায় সময় সন্ত্রাসী ও অপরাধীরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জালে ধরা পড়ছে। গত ৮ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জের বন্দরে পরিত্যাক্ত অবস্থায় ম্যাগাজিনসহ একটি বিদেশি পিস্তল, গত ৮ মার্চ নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে অস্ত্র কেনাবেচার সময় দুটি বিদেশি পিস্তল, দুটি ম্যাগজিন ও আট রাউন্ড গুলি সহ দুজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গত ৩ মার্চ নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় দুই রাউন্ড গুলি ও পিস্তল সহ দুই সহোদরকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এভাবে বিভিন্ন সময় অবৈধ অস্ত্র সহ অপরাধীদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ফলে অবৈধ অস্ত্রের ছড়াছড়ি দেখে জনমনে আতঙ্ক ক্রমশ বাড়তে শুরু করে। এসব নানা ঘটনার পর পুলিশ প্রশাসন নড়েচড়ে বসে। একের পর এক অভিযান চালিয়ে বিভিন্ন সময় অস্ত্র উদ্ধার সহ সন্ত্রাসীদের আইনের আওতায় নিয়েছে। 

মতামত দিন

বিজ্ঞপ্তি
সবার আগে সব খবর পেতে ভিজিট করুন - voiceofnarayanganj.com I যে কোন সংবাদ বা বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন - 01963958226 / 01819136738 অথবা মেইল করুন - voiceofnarayanganj24@gmail.com