প্রধান খবর

কালামের স্বপ্নে মাকসুদের হানা

নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের বিএনপির মনোনীত প্রার্থী ও তিনবারের সাবেক সংসদ সদস্য আবুল কালাম যখন অনেকটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছিল তখনি এলো দুঃসংবাদ। আপিল করে প্রার্থীতা ফিরে পেয়েছেন এই আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মাকসুদ হোসেন। যিনি ২০২৪ সালে প্রভাবশালী এমপি শামীম ওসমান ও সেলিম ওসমানের সিদ্ধান্তের বিরোধীতা করে বিপুল ভোটের ব্যবধানে তৎকালীন সময়ে উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন। ফলে বন্দর উপজেলায় তার বেশ বড় ভোট ব্যাংক রয়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। এতে করে বিএনপি প্রার্থী আবুল কালামের নেতাকর্মীদের মধ্যে বেশ অস্বস্তি বিরাজ করছে। কারণ সর্বশেষ মাকসুদ হোসেন ব্যতীত এই আসনে তেমন কেউ শক্তিশালী প্রার্থী ছিলেননা। যেকারণে বিশাল ভোটের ব্যবধানে জয়ের হিসেব কষতে শুরু করেছিল কালাম অনুসারীরা। এবার সেই স্বপ্নে স্বতন্ত্র প্রার্থী মাকসুদ হোসেন হানা দিয়েছেন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। 
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকার আমলে ওসমান পরিবারের বিরুদ্ধে গিয়ে নির্বাচন করে বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয় পেয়েছে মাকসুদ হোসেন। যেকারণে এবার তিনি প্রার্থীতা ফিরে পাওয়ায় এই আসনে বিএনপি প্রার্থী কালামের সাথে তার বেশ হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে বলে মনে করছেন বোদ্ধামহল। এতে কালাম বলয়ে বেশ ঘাম ঝড়াতে হবে নির্বাচনের মাঠে। এ নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
জানা গেছে, এই আসনে বিএনপি দল থেকে চার জন প্রার্থী ছিলেন। তবে বেশ নাটকীয়তার পর একজন প্রার্থী আবুল কালাম মাঠে রয়েছেন। অন্যদিকে জোটের প্রার্থীর কারণে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মইন আহমেদ প্রার্থীতা প্রত্যাহার করে নেন। তবে তার পথের কাটা হিসেবে ছিলেন স্বতন্ত্র প্রার্থী মাকসুদ হোসেন। কিন্তু মনোনয়ন যাচাই বাছাই প্রক্রিয়ার মাকসুদ হোসেনের মনোনয়ন বাতিল হলে কালাম বলয়ে বেশ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছিলেন নেতাকর্মী ও অনুসারীরা। 
তবে বিপত্তি বাধে গত ১২ জানুয়ারি স্বতন্ত্র প্রার্থী মাকসুদ হোসেনের মনোনয়ন পত্র ফিরে পাওয়ার মধ্য দিয়ে। এর আগে গত ৩ জানুয়ারি যাচাই-বাছাই শেষে স্বতন্ত্র প্রার্থী মাকসুদ হোসেনের মনোনয়নপত্র বাতিল করেন জেলা রিটানিং কর্মকর্তা রায়হান কবির। পরে রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনে (ইসি) আপিল করলে তার প্রার্থীতা ফিরিেেয় দেওয়া হয়।
এতে নানা প্রশ্ন উঠছে বিএনপি দল থেকে প্রাথমিক পর্যায়ে ব্যবসায়ী মাসুদুজ্জামান মাসুমকে মনোনয়ন পত্র দেওয়া হলে এর বিরোধীতা করে মহানগর বিএনপি বড় অংশ সহ বর্তমান প্রার্থী আবুল কালাম। ফলে এখন আবুল কালাম চূড়ান্ত মনোনয়ন পেলে গেলে মাসুদুজ্জামান মাসুদ সহ তার অনুসারীরা প্রকাশ্যে অথবা পরোক্ষভাবে কালাম বিরোধীতা করতে পারে। এ নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
দলীয় ও স্থানীয় স‚ত্রে জানা গেছে, গত ৩ নভেম্বর বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে এ জেলার চারটি আসনে বিএনপির প্রার্থী ঘোষণা করে। যার মধ্যে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে শিল্পপতি মাসুদুজ্জামান মাসুদকে প্রার্থী ঘোষণা করে বিএনপি। এরপর থেকে ভোট চেয়ে এলাকায় ব্যাপক গণসংযোগ, সভা-সমাবেশ করে আসছিলেন তিনি।
তবে এই আসনে মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন সাবেক সংসদ সদস্য ও মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি আবুল কালাম, মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক সাখাওয়াত হোসেন খান, সদস্য সচিব আবু আল ইউসুফ খান টিপু ও বিএনপি নেতা আবু জাফর বাবুল। প্রথম থেকে তারা সবাই মাসুদুজ্জামানের বিরোধিতা করে আসছিলেন। এর ধারাবাহিকতায় গত ১৫ নভেম্বর নারায়ণগঞ্জ-৫ (শহর-বন্দর) আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী মাসুদুজ্জামান মাসুদের প্রার্থিতা বাতিলের দাবিতে একাট্টা হয়ে এক টেবিলে বসেন এই চার মনোনয়ন প্রত্যাশী। ওই দিন নারায়ণগঞ্জ ক্লাবে তারা সবাই একসঙ্গে বসে সংবাদ সম্মেলন করে তার প্রার্থিতা বাতিলের দাবি করেন।
তাদের দাবি, ‘বিগত ১৭ বছর আওয়ামী লীগের ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে তৃণম‚লসহ অনেকেই নির্যাতিত হয়েছে। এসব তৃণম‚লকে ম‚ল্যায়িত করা হয়নি। তাই এ মনোনয়ন পরিবর্তনের দাবি তোলেন তারা। তাদের মধ্য থেকে যেকোনও একজনকে মনোনয়ন দেওয়া হলে তারা সবাই এক হয়ে কাজ করবেন বলে ঘোষণা দেওয়া হয়।’ এই ঘটনার মধ্য দিয়ে তারা বিভিন্ন সময় মাসুদুজ্জামানের বিরোধিতা করে নানা বক্তব্য দিয়েছেন।
তবে এই ঘটনার কিছু দিন পর নাটকীয়ভাবে বলয় পরিবর্তন করে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী মাসুদুজ্জামান মাসুদের পক্ষে কাজ শুরু করেন মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব আবু আল ইউসুফ খান টিপু। ওই সময় তিনি মাসুদুজ্জামানের সভা-সমাবেশে ও নির্বাচনি প্রচারণায় বেশ ঘটা করে চালিয়েছেন। অন্যদিকে মনোনয়ন বঞ্চিত বাকি তিন জনের বিরোধপ‚র্ণ বক্তব্য অব্যাহত ছিল।
এসব ঘটনার মধ্যে আকস্মিকভাবে গত ১৬ ডিসেম্বর দুপুরে নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে নিরাপত্তা ইস্যু ও পারিবারিক চাপের কারণে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মাসুদুজ্জামান মাসুদ।
তবে এই ঘটনার পর থেকে মাসুদুজ্জামান বলয়ের নেতাকর্মী, অনুসারী ও সমর্থকরা ক্ষোভ প্রকাশ করে তার সিদ্ধান্ত বদলের দাবি জানিয়ে আসছিল। সর্বশেষ সিদ্ধান্ত বদল না করলে মাসুদুজ্জামানের বাড়ি ও ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান ঘেরাও করার ঘোষণা দিয়েছেন তারা। এর ফলশ্রæতিতে গত শুক্রবার (১৯ ডিসেম্বর) বিকালে সিদ্ধান্ত বদল করে নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়েছেন মাসুদুজ্জামান মাসুদ।
এদিকে এই ঘটনার মাত্র একদিনের ব্যবধানে শনিবার (২০ ডিসেম্বর) নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের পক্ষ থেকে প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন জেলা মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান। এর কয়েকদিন পর বিএনপির চূড়ান্ত মনোনয়ন পেয়েছেন বলে জানান আবুল কালাম। ফলে বিএনপি দলটির মধ্যে মনোনয়ন ইসুতে নানা বিরোধের মধ্য দিয়ে দ্ব›দ্ব বিভক্তি স্পষ্ট হয়েছে। যে বিষয়টি ভোটের মাঠে বেশ প্রভাব ফেলবে। তার উপরে স্বতন্ত্র প্রার্থী মাকসুদ হোসেন বিগত আওয়ামী লীগ সরকার আমলে প্রভাবশালী শামীম ওসমান ও সেলিম ওসমানের বিরোধীতা করে উপজেলা চেয়ারম্যান পদে জয়ী হয়েছিলেন। যেকারণে তাকে নিয়ে কালাম বলয়ে চিন্তার ভাজ পড়েছে।
জানা গেছে, ২০২৪ সালে বন্দর উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচনে নৌকার প্রার্থী ও তৎকালীন চেয়ারম্যান এম এ রশিদের সাথে প্রতিদ্ব›দ্বীতা করে বিপুল ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছিলেন স্বতন্ত্র প্রার্থী মাকসুদ হোসেন। ওই নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে রশিদ পেয়েছেন ১৪ হাজার ৮৩৮ ভোট। তার প্রাপ্ত ভোটের বিপরীতে দ্বিগুণেরও বেশি ভোট পেয়ে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন মাকসুদ। তিনি পেয়েছেন ২৯ হাজার ৮৭৩ ভোট। এছাড়া বিএনপির আরেক প্রার্থী ও সাবেক চেয়ারম্যান আতাউর রহমান মুকুল ১২ হাজার ৬২২ ভোট পেয়েছিলেন। ওই নির্বাচনে প্রকাশ্যে ওসমান পরিবারের সদস্য ও সংসদ সদস্যরা নৌকার প্রার্থী এম এ রশিদকের সমর্থন দিয়েছিলেন।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ওই নির্বাচনে তফসিল ঘোষণার পর এক অনুষ্ঠানে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য একেএম সেলিম ওসমান চেয়ারম্যান পদে এমএ রশিদকে নিজের পছন্দের প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা দেন। সেলিম ওসমান নিজে জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য হলেও তার দলের নেতা মাকসুদকে সমর্থন না দিয়ে রশিদের পক্ষে অনুসারীদের কাজ করার নির্দেশ দেন।
তবে মাকসুদ হোসেন নির্বাচন থেকে সরে না দাড়ানোয় প্রকাশ্যে ক্ষোভ ঝাড়েন সেলিম ওসমান। তার প্রয়াত বড়ভাই নাসিম ওসমানের দশম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে ওই বছরের ৩০ এপ্রিল বন্দরে এক অনুষ্ঠানে চেয়ারম্যান প্রার্থী মাকসুদকে ইঙ্গিত করে সংসদ সদস্য সেলিম ওসমান বলেন, 'একজন রাজাকার সন্তান, জমি দখলকারী; তার পোস্টার কী করে এলাকায় লাগে, শত শত গাড়ি বের করে? মানুষ অবজেকশন দিলে উনি বলেন, 'সরি' আর নির্বাচন কমিশন ওনাকে ছেড়ে দেন। প্রশাসনের লোকজন ঘুমায়ে গেলে হবে না, এগুলা দেখতে হবে।'
একই অনুষ্ঠানে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য এ কে এম শামীম ওসমান বলেন, 'এইখানে এসে শুনলাম, কেউ কেউ এমন এমন বক্তব্য দিচ্ছেন আর এমন এমন কথা বলছেন, ওই কথাগুলো যদি আমলে নেই তাহলে আগামীকাল থেকে কেউ মাঠে নামতে পারবেন না। আমি সেলিম ওসমান না, আমরা জানি কী করতে হবে। আমরা চাই সুষ্ঠু ও সুন্দর নির্বাচন হোক। যার কপালে লেখা আছে সে পাস করবে। কিন্তু কথাবার্তা সীমানার মধ্যে রাখেন।'
শামীম ওসমান প্রকাশ্যে কোনো প্রচারণায় না থাকলেও তার অনুসারী আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা রশিদের পক্ষে নির্বাচনে কাজ করেছেন।
এদিকে এবার সেই মাকসুদ হোসেন স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসন থেকে লড়াইয়ে নেমেছেন। 
মনোনয়ন ফিরে পাওয়ার বিষয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী মাকসুদ হোসেন বলেন, নির্বাচনে আমার প্রার্থীতা বৈধ হয়েছে। শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের মাঠে থাকাবো। এবং জয়ের বিষয়ে আশাবাদী। 
শঙ্কার বিষয়ে তিনি বলেন, বিএনপি একটি বড় দল। সেই বড় দলের প্রার্থীর বিরুদ্ধে নির্বাচন করলে শঙ্কা তো কিছুটা থেকেই যায়।
মামলা থাকা সত্তে¡ও নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, মামলা নিয়ে আপত্তি থাকলে আমার মনোনয়ন পত্র বৈধতা ঘোষণা করতো না। সুতরাং মামলা নিয়ে মনোনয়নের ক্ষেত্রে কোন ধরনের সমস্যা নেই। 
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকার আমলে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির বিরোধীতা করে রীতিমত ওসমান পরিবারের চক্ষু শূল হয়েছিলেন মাকসুদ হোসেন। তবে সে সময় বিএনপি দলে থাকলেও কালাম হোসেন পরিবার ক্ষমতাসীন দলের লোকজনের সাথে আতাত করে বেশ সুবিধাজনক অবস্থায় ছিলেন বলে নানা অভিযোগ রয়েছে। ফলে এসব কারণে ভোটের সমীকরণে পথ বেশ কঠিন হয়ে পড়বে এই বিএনপি প্রার্থীর জন্য। 

মতামত দিন

বিজ্ঞপ্তি
সবার আগে সব খবর পেতে ভিজিট করুন - voiceofnarayanganj.com I যে কোন সংবাদ বা বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন - 01963958226 / 01819136738 অথবা মেইল করুন - voiceofnarayanganj24@gmail.com