ভাষা আন্দোলনে নারায়ণগঞ্জের ভূমিকা
১৯৫২ সালের জানুয়ারি মাসে প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দিনের পল্টনের বক্তৃতার পর সমগ্র প‚র্ববঙ্গের মতো নারায়ণগঞ্জের ছাত্রসমাজও উচ্চকিত হয়ে উঠে। ফেব্রæয়ারি মাসের ৪ তারিখে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালিত হয়। রাষ্ট্র ভাষা বাংলার দাবিতে জয় গোবিন্দ হাই স্কুল থেকে এক বিরাট ছাত্র মিছিল বের করে অন্যান্য স্কুলের মিছিলের সাথে মিলিত হয়ে সমগ্র নারায়ণগঞ্জ শহর প্রদক্ষিণ করে। বিকেল তিনটায় রহমতুল্লাহ ক্লাব চত্বরে সমবেত হয়। এখানে একেএম শামসুজ্জোহার সভাপতিত্বে এক ছাত্র সভা অনুষ্ঠিত হয়। ছাত্র নেতা শামসুল হুদা, সুলতান মাহমুদ মল্লিক প্রমুখ এ সভায় বক্তৃতা করেন। এভাবে পুরো ফেব্রæয়ারি মাস জুড়েই নারায়ণগঞ্জের ছাত্রসমাজ রাষ্ট্র ভাষা বাংলার দাবিতে প্রায় প্রতিদিনই ধর্মঘট মিছিল এবং বিক্ষোভের মধ্য দিয়ে শহরকে উদ্বুদ্ধ করে রাখে।
২১ ফেব্রæয়ারিতে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহবানে নারায়ণগঞ্জের ছাত্র নেতৃবৃন্দ ধর্মঘটের বিরাট আয়োজন করে। ২০ ফেব্রæয়ারি ছাত্র কর্মীগণ পোস্টারে পোস্টারে সমগ্র নারায়ণগঞ্জ শহর ছেয়ে ফেলে। খান সাহেব ওসমান আলীর চাষাড়ার বাসভবন বায়তুল আমানে গভীর রাত পর্যন্ত এই পোস্টারগুলো লিখেন মুস্তাফা মনোয়ার এবং অন্য ছাত্র কর্মীগণ।
পরের দিন অর্থাৎ ২১ ফেব্রæয়ারি ছাত্রদের বিরাট মিছিল নারায়ণগঞ্জ শহরকে প্রকম্পিত করে তোলে। মিছিল শেষে আবুল হাশিমের সভাপতিত্বে রহমতুল্লাহ ক্লাবে এক বিরাট জনসভা অনুষ্ঠিত হয়।সভায় বক্তৃতা করেন আলমাছ আলী, মুস্তাফা সারোয়ার, মুজিবুর রহমান। যখন এই সভা চলছিল ঠিক তখনই ঢাকায় ছাত্রদের ওপর গুলিবর্ষণের নিদারুণ খবরটি আসে। খবরটি প্রচারিত হবার সাথে সাথে সভায় উপস্থিত নেতৃবৃন্দ এবং শ্রোতামÐলী প্রচÐ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। তৎক্ষণাৎ এক বিরাট মিছিল নারায়ণগঞ্জ শহরকে উত্তপ্ত করে তোলে। ২২ ফেব্রæয়ারি শুক্রবার দিনটিও মিছিলে বিক্ষোভে নারায়ণগঞ্জ শহরটি ছিল সরগরম।
২৩ ফেব্রæয়ারি নারায়ণগঞ্জ শহরে প‚র্ণ হরতাল পালিত হয়। এই হরতালের ব্যাপারে আওয়ামী মুসলিম লীগের অভ্যন্তরে মতনৈক্য দেখা দিলে তৎকালীন যুবনেতা শফি হোসেন খান এবং একেএম শামসুজ্জোহার অনমনীয় দৃঢ়তায় তা স্বার্থকভাবে কার্যকর হয়। ঐদিন বিকেলে মহিলা কলেজের সামনে খোলা জায়গায় ফয়েজ আহমদের সভাপতিত্বে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়।
২৮ ফেব্রæয়ারি আন্দোলনের অন্যতম নেত্রী এবং নারায়ণগঞ্জের মর্গ্যান বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা মমতাজ বেগমকে গ্রেফতার করায় নারায়ণগঞ্জে আন্দোলন তীব্রতর হয়ে ওঠে। নারায়ণগঞ্জের পথ কেটে, রেল লাইন উঠিয়ে গাছ কেটে ঢাকা থেকে পাক সৈন্য আসার পথ বন্ধ করে বিরাট গণআন্দোলন ও বিক্ষোভ শুরু হল। বহু কষ্ট করে বাধা বিপত্তির মধ্যে পাক সৈন্য নারায়ণগঞ্জে প্রবেশ করে আওয়ামীলীগ ছাত্রলীগ দপ্তর বায়তুল আমানের সামনে খÐ যুদ্ধ শুরু করে। পাঞ্জাব রেজিমেন্টের সৈন্যরা ১৪ ঘণ্টা অবরোধ করে বায়তুল আমানসহ আশপাশের দোকানপাট এবং মসজিদ ভেঙ্গে চ‚র্ণ বিচ‚র্ণ করে।
মমতাজ বেগমের গ্রেফতারের সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে সমস্ত নারায়ণগঞ্জ শহর তীব্র রোষে ফেটে পড়ে। অবস্থা বেগতিক দেখে সরকারের পক্ষ থেকে অপপ্রচার চালানো হয় যে, স্কুলের তহবিল তসরুফের কারণে তাকে গ্রেফতার কড়া হয়েছে। ছাত্র জনতা সরকারের এই মিথ্যা প্রচারকে অগ্রাহ্য করে নারায়ণগঞ্জ আদালত ভবন ঘেরাও করে রাখে। অবস্থা চরম আকার ধারণ করলে পুলিশ কর্তৃপক্ষ মমতাজ বেগমকে ঢাকায় নিয়ে যাবার চেষ্টা চালায়। ফলে চাষাড়ার বায়তুল আমানের সামনে জনতার সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ বেঁধে যায়। বিক্ষুদ্ধ জনতা ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রাস্তায় বড় বড় গাছ কেটে অবরোধ সৃষ্টি করে। এই সময় পুলিশ বেপরোয়াভাবে বিক্ষোভকারীদের লাঠিচার্জ করে। রাত প্রায় ৮ টায় নারায়ণগঞ্জের কর্মীদের ৫০/৬০ জনকে গ্রেফতার করে চাষাড়ার পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে একটি ছোটো ঘরে আটক করে রাখে। অত্যচার চালিয়ে তৎকালীন এসপি ইদ্রিস ঢাকায় চীফ সেক্রেটারি মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমিনকে জানায় ‘এভরিথিং ইজ আন্ডার কন্ট্রোল’।
নারায়ণগঞ্জ কোর্টে ছাত্রী বিক্ষোভ মিছিল আসার সময় মিছিলে ছাত্রীদের উপর লাঠি নিয়ে বাধা দিতে পুলিশ উদ্যত হলে মুস্তাফা সারোয়ার কোমরে পিস্তলওয়ালা একজন পুলিশ সার্জেন্ট হাবিবুর রহমানকে ধাক্কা দেন। এরপরও পুলিশ সার্জেন্ট তাকে গ্রেফতার করেননি বাংলা ভাষার সমর্থক হওয়ায়।
রাষ্ট্র ভাষা আন্দোলনের এক পর্যায়ে মর্গ্যান উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের তৎকালীন ছাত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী নিজের আঙ্গুল কেটে রক্ত দিয়ে রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই ব্যানার লিখেন।
ভাষা আন্দোলনের সময় নারায়ণগঞ্জের রাস্তায় রাস্তায় পিচের উপর লেখা ‘রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই’ ‘পুলিশ জুলুম বন্ধ কর’ ইত্যাদি ¯েøাগান। বিলাস নামে এক কর্মী রাত জেগে জেগে পুলিশের অগোচরে খড়ি মাটি দিয়ে এ সমস্ত ¯েøাগান লিখতেন।
আন্দোলন চলাকালীন নারায়ণগঞ্জ থেকে যারা গ্রেফতার হয়ে ছিলেন তাঁদের মধ্যে ছিলেন একেএম শামসুজ্জোহা, নুরুল ইসলাম মল্লিক, শফি হোসেন খান, লুতফর রহমান, জানে আলম, এম এইচ জামিল, বাদশা মিয়া, নাজির হোসেন, সুলতান মোহাম্মদ, মুস্তাফা মনোয়ার, মশিয়ার রহমান, আজগার আলী, জালাল উদ্দিন, নিখিল সাহা, শামছুর রহমান, শাজাহান মল্লিক, আবু বকর সিদ্দিক, কবির উদ্দিন, নাছির উল্লা, আব্দুল মোতালিব, রুহুল আমিন, জ্বালাল আহাম্মেদ দুলু আফেন্দি, হাদিস মোল্লা, সুবিমল গুহ, মুস্তাফা সারোয়ার, ও ৮ বছরের বালক মোসলেহ উদ্দিন। এছাড়াও নারায়ণগঞ্জে ভাষা আন্দোলনে নির্যাতিত হয়েছেন আলমাছ আলী, বজলুর রহমান, সুলতান মাহমুদ মল্লিক, কাজী মজিবর রহমান, দাইমুদ্দিন, কাজী নজরুল ইসলাম, হাফিজ মিয়া প্রমুখ।
মশগুল মহফিলের পক্ষ থেকে একটি ব্যতিক্রমি প্রতিবাদ মিছিল বের হয়। মশগুল মহফিলের সদস্য আবুল কালাম আজাদকে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কোরায়শী ও মহিউদ্দিন কে মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমিন সাজিয়ে এবং নানা প্রকার ব্যাঙ্গাত্মক ¯েøাগান সংবলিত ফেস্টুন নিয়ে একটি বর্ণাঢ্য মিছিলসহ শহর প্রদক্ষিণ করে। এই ফেস্টুনগুলো লিখেন বেপারী পাড়ার ‘ফুল কবি’ পিয়ার মোহাম্মদ ও শাহেদ আলী মজনু। আফজাল হোসেন ও আব্বাছের নেতৃত্বে এই মিছিলটিতে অংশ নেন পিয়ার মোহাম্মদ, আমজাদ, মান্নান, শাহেদ আলী মজনু, মতিউর রহমান টুক্কু, জালাল আরফান নুরু, আলী হোসেন কালু, ওমর চান মিয়া সহ অনেকেই।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে নারায়ণগঞ্জের নারীদের মধ্যে যাঁদের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য তাঁদের মধ্যে মর্গ্যান বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের তৎকালীন প্রধান শিক্ষিকা মমতাজ বেগম, ইলা বক্সী, মণিমালা, বেলু বেগম, আয়েশা বেগম, ফিরোজা বেগম, রেজিয়া খাতুন ও বিজলি অন্যতম। বিভিন্ন বিদ্যালয়ের ছাত্রী শিক্ষিকা এবং শহরের বিভিন্ন স্থানের সচেতন নারীগণ এই আন্দোলনে পুরুষের পাশাপাশি পুলিশি নির্যাতন ও কারাভোগে শরিক হন। মমতাজ বেগম আন্দোলনরত নারীদের নেতৃত্ব দান করেন।
মতামত দিন