শামীম ওসমানের স্বপ্ন, পূরণ করলেন সাখাওয়াত
প্রাচ্যের ডান্ডি খ্যাত নারায়ণগঞ্জ শহরকে ঘিরে যে পৌরসভার জন্ম, তার বয়স প্রায় দেড় শতাব্দী। ১৮৭৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বর ব্রিটিশ শাসনামলে প্রতিষ্ঠিত সেই পৌরসভা ২০১১ সালের ৫ মে রূপান্তরিত হয় নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনে। আর সিটি কর্পোরেশন প্রতিষ্ঠার প্রথম দিন থেকেই এই নগরীর প্রতিটি ক্ষমতাবান মানুষের চোখে একটাই স্বপ্ন মেয়রের চেয়ারটি নিজের করে নেওয়া।
সেই স্বপ্নের তালিকায় সবচেয়ে উচ্চস্বরে যার নাম উচ্চারিত হতো, তিনি নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও গডফাদার খ্যাত শামীম ওসমান। ২০০৯ সালের সংসদ নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষিত হয়ে অংশ নিতে না পারলেও আওয়ামী সরকার ক্ষমতায় আসার পর রাষ্ট্রীয় পদহীন শামীম ওসমানের দৃষ্টি গিয়ে পড়ে সিটি কর্পোরেশনের দিকে।
২০১১ সালের প্রথম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে দলীয় সমর্থনে মাঠে নামেন তিনি। কিন্তু তার সামনে দাঁড়িয়ে গেলেন এক অপ্রতিরোধ্য প্রতিদ্ব›দ্বী নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান আলী আহমদ চুনকার মেয়ে ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েও আইভী তখন এগিয়ে ছিলেন তিনটি শক্তিতে পৌরসভা চেয়ারম্যান হিসেবে নিজের কাজের সুনাম, প‚র্বের জনপ্রিয়তা এবং সর্বোপরি ওসমান পরিবারের প্রতি নারায়ণগঞ্জবাসীর দীর্ঘদিনের ক্ষোভ। এই তিন সমীকরণে শেষ পর্যন্ত ব্যাপক জনসমর্থন নিয়ে জয় ছিনিয়ে নেন আইভি, আর মেয়র হওয়ার স্বপ্নভঙ্গ হয় শামীম ওসমানের।
তবে হার মেনে নেননি তিনি। পরের দুটি নির্বাচনেও, ২০১৬ এবং ২০২২ সালে, আইভির বিপরীতে প্রতিদ্ব›দ্বীদের পর্দার আড়াল থেকে সমর্থন দিয়ে গেছেন শামীম ওসমান। ২০১৬ সালে ধানের শীষ প্রতীকে অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান এবং ২০২২ সালে হাতি প্রতীকে স্বতন্ত্র প্রার্থী অ্যাডভোকেট তৈমুর আলম খন্দকার দুজনকেই গোপনে মদদ দিয়েছিলেন তিনি। উদ্দেশ্য একটাই, যে আইভীর কারণে নিজে মেয়রের চেয়ারে বসতে পারেননি, সুতরাং তাকে সেই চেয়ার থেকে নামানো। কিন্তু সেই কৌশলেও সাফল্য আসেনি।
ঘটনার মোড় ঘুরে যায় ২০২৪ সালে। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের জেরে ৫ আগস্ট আওয়ামী সরকারের পতন হলে মেয়র আইভীকে সিটি কর্পোরেশন থেকে অপসারণ করা হয়। ৮ আগস্ট অন্তর্র্বতীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সারাদেশের অন্যান্য সিটি কর্পোরেশনের মতোই নারায়ণগঞ্জেও একজন সরকারি প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়।
এরপর আসে সেই মুহ‚র্ত, যখন ইতিহাসের চাকা ঘুরে সাখাওয়াতের দিকে তাকায়। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রæয়ারি নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল সরকার গঠন করলে সরকারি প্রশাসককে সরিয়ে দলীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানকে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক হিসেবে নিযুক্ত করা হয়।
রাজনীতির এই দীর্ঘ পথচলায় এভাবেই বাস্তবে রূপ নেয় সাখাওয়াতের সেই পুরনো স্বপ্ন। তবে ইতিহাসের এক অদ্ভুত পরিহাস এখানেই- এই স্বপ্নটা একদিন দেখেছিলেন শামীম ওসমান, তার নিজের জন্য।
মতামত দিন