মান্নান ডুবাতে প্রস্তুত গিয়াস রেজাউল
নারায়ণগঞ্জ-৩ আসন (সোনারগাঁ ও সিদ্ধিরগঞ্জ) নিয়ে গঠিত হয়েছে। এই আসনে বিএনপি দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন আজহারুল ইসলাম মান্নান। তার আসনে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে দুজন স্বতন্ত্র প্রার্থী রয়েছেন। তারা হলেন- সাবেক সংসদ সদস্য মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন ও টানা চারবারের সংসদ সদস্য এবং সাবেক প্রতিমন্ত্রী রেজাউল করিম। এদের মধ্যে গিয়াস উদ্দিন সিদ্ধিরগঞ্জের বাসিন্দা হওয়ায় স্বাভাবিকভাবে তিনি সেখানকার সবচেয়ে বেশি ভোট টানবেন। একইভাবে সাবেক প্রতিমন্ত্রী রেজাউর করিম সোনারগাঁয়ের ভোট টানবেন। এছাড়া জুলাই বিপ্লবের ক্ষোভের কারণে আওয়ামী লীগের বিশাল ভোট ব্যাংক বিএনপি ও জামায়াত জোটের প্রার্থীদের কাছ থেক মুখ ফিরিয়ে নেবেন। ফলে তারা বিদ্রোহীদের দিকে ঝুকতে পারেন। এছাড়া দুজন বিদ্রোহী প্রার্থী ছাড়াও জামায়াতে ইসলামী দলটির প্রার্থী ইকবাল হোসেন ভূইয়ার সাথেও ধানের শীষের প্রার্থীকে লড়াই করতে হবে। ফলে সব মিলিয়ে বেশ কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবেন বিএনপি প্রার্থী।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভোট সমীকরণের চুলচেরা বিশ্লেষণে বিগত দিনে বিএনপির নেতাকর্মীদের নানা বিতর্কিত কর্মকান্ডের উপরে জনসাধারণের ক্ষোভ সহ নানা কারণে বিএনপি প্রার্থী পিছিয়ে রয়েছেন। সে দিক থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা বেশ এগিয়ে রয়েছেন।
জানা গেছে, সাবেক প্রতিমন্ত্রী রেজাউল করিম নারায়ণগঞ্জ-৩ (সোনারগাঁ) আসন থেকে ১৯৯১ সালে পঞ্চম, ১৯৯৬ সালে ষষ্ঠ, ১৯৯৬ সালে সপ্তম ও ২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এছাড়া ২০০৩ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
এছাড়া নারায়ণগঞ্জ-৪ (ফতুল্লা-সিদ্ধিরগঞ্জ) আসন থেকে ২০০১ সালে বিপুল ভোটের ব্যবধানে শামীম ওসমানকে হারিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন।
তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে নারায়ণগঞ্জ-৩ ও ৪ আসনের সীমানা পরিবর্তন করা হয়। সে হিসেবে নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে সোনারগাঁয়ের পাশাপাশি সিদ্ধিরগঞ্জ থানা যুক্ত হয়েছে। অপরদিকে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে সিদ্ধিরগঞ্জ থানা এলাকা কমে গিয়ে ফতুল্লা ও সদর উপজেলার দুইটি ইউনিয়ন যুক্ত করা হয়।
জেলা নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ-৩ (সোনারগাঁ ও সিদ্ধিরগঞ্জ) আসনে ১১ জন প্রার্থী রয়েছে। প্রার্থীরা হলেন- বিএনপির প্রার্থী আজহারুল ইসলাম মান্নান, স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন বিএনপি দলীয় সাবেক সংসদ সদস্য মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন ও বিএনপি দলের সাবেক প্রতিমন্ত্রী রেজাউল করিম।
এ আসনে জামায়াত সহ ১০ দলীয় জোট থেকে ৪ জন রয়েছেন- তারা হলেন-জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ইকবাল হোসেন ভ‚ঁইয়া, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের আতিকুর রহমান নান্নু মুন্সী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মো. শাহজাহান, আমার বাংলাদেশ পার্টির আরিফুল ইসলাম।
এছাড়া আরও রয়েছে ইসলামী আন্দোলনের গোলাম মসীহ্, গণসংহতি আন্দোলনের অঞ্জন দাস, জনতার দলের আবদুল করিম মুন্সী ও গণঅধিকার পরিষদের মো. ওয়াহিদুর রহমান মিল্কী।
এদিকে এই আসনে বিএনপির প্রার্থী আজহারুল ইসলাম মান্নানের প্রতিদ্ব›দ্বী হিসেবে দুজন বিদ্রোহী প্রার্থী নির্বাচনী মাঠে রয়েছেন। তাদের মধ্যে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছেন মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন ও ধারাবাহিকভাবে রেজাউল করিম। তবে ২০০১ সালে সিদ্ধিরগঞ্জ ও ফতুল্লা থেকে বিপুল ভোটের ব্যবধানে শামীম ওসমানকে হারিয়ে বিজয়ী হয়েছিলেন এই বিদ্রোহী প্রার্থী গিয়াস উদ্দিন। তবে এবারের নির্বাচনের তিনি নারায়ণগঞ্জ-৩ ও ৪ আসন থেকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছেন। এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের অধীনে সিদ্ধিরগঞ্জ থানা এলাকা পড়েছে। ফলে এই এলাকার তার সবচেয়ে বেশি ভোট পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাছাড়া তিনি সিদ্ধিরগঞ্জের বাসিন্দা। এছাড়া সোনারগাঁয়ে অনেক নেতাকর্মীকে ইতিমধ্যে গিয়াস উদ্দিনের পাশে দেখা যাচ্ছে। সোনারগাঁ বিএনপি পদধারী অনেকে গিয়াস উদ্দিনের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণায় নেমে বহিষ্কার হয়েছেন পদ হারিয়েছেন। ফলে স্বাভাবিকভাবে সোনারগাঁয়ে বিএনপির প্রার্থী আজহারুল ইসলাম মান্নানের বিরোধীতা কারী বিএনপির নেতাকর্মী ও ভোটাররা গিয়াস উদ্দিনের সাথে রয়েছে তা বেশ স্পষ্ট হয়েছে। তবে ভোটের সমীকরণে জয়-পরাজয় নিশ্চিত হবে ১২ তারিখের ভোট যুদ্ধের মধ্য দিয়ে। তবে হিসেবের চুলচেরা বিশ্লেষণে আপাতত গিয়াস উদ্দিন এগিয়ে রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এই আসনে টানা চার মেয়াদে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া সব প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন রেজাউল করিম। ফলে সে আসতে তার বিশাল ভোট ব্যাংক রয়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। এদিক থেকে বেশ পিছিয়ে রয়েছেন আহজারুল ইসলাম মান্নান। তাছাড়া বিদ্রোহী প্রার্থীদের সাথে সোনারগাঁ বিএনপির কোন নেতাকর্মীকে দেখলেই বহিষ্কার করা হচ্ছে। যেকারণে মান্নান বলয় বেশ ভীত হয়ে একের পর এক বহিষ্কার করা হচ্ছে বলে মনে করছেন তৃণমূল বিএনপির নেতাকর্মীরা।
এছাড়া এই আসনে জামায়াতে ইসলামী সহ ১০ দলীয় জোট থেকে অনেক নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ইকবাল হোসেন ভূইয়া নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। যদিও এই আসনে জামায়াত জোট থেকে আরও তিন জন প্রার্থী রয়েছেন। তবে জনপ্রিয়তার দিক থেকে দাঁড়িপাল্লার এই প্রার্থীর গ্রহণযোগ্যতা বেশি রয়েছে। ফলে বিদ্রোহী প্রার্থীদের পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামীর এই প্রার্থীর সাথে ধানের শীষের প্রার্থী আজহারুল ইসলাম মান্নানকে লড়াই করতে হবে।
এছাড়া জুলাই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ দলটি ক্ষমতাচ্যুত হলে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। যেকারণে তারা এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারেনি। তবে তাদের ভোট ব্যাংক রয়ে গেছে। জুলাই বিপ্লবের আন্দোলন সহ সরকার পতনের ক্ষোভ থেকে আওয়ামী লীগের ভোটারা বিএনপি কিংবা জামায়াত জোটের প্রার্থীদের বেছে নেবে না। তারা বিদ্রোহী প্রার্থীদের বেছে নিতে পারে। সে হিসেবে গিয়াস উদ্দিন ও রেজাউল করিম বেশ এগিয়ে রয়েছেন।
এদিকে ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের পর চাঁদাবাজি, ছিনতাই, দখলবাজি, জাহাজ কেটে বিক্রি করে দেওয়া, সন্ত্রাসীপনা সহ নানা বিতর্কিত কর্মকান্ডের কারণে সোনারগাঁয়ে বিএনপির অনেক নেতাকর্মীদের উপর জনগণ ক্ষুব্ধ হয়ে উঠে। তবে ক্ষমতার দাপটের কারণে অনেকেই ছিলেন অসহায়। কারণ বিএনপি প্রার্থী আজহারুল ইসলাম মান্নানের সাথে অনেক বিতর্কিত নেতাকর্মীদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সখ্যতা ছিল। যেকারণে সবাই মুখ বুজে সব অত্যাচার নির্যাতন সহ্য করে গেছেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি দলীয় প্রার্থী জয়লাভ করলে এখানকার অত্যাচারের মাত্রা আরও কয়েকগুণ বেড়ে যাবে। একারণে সচেতন ভোটাররা বিদ্রোহী প্রার্থীদের দিকে ঝুকে পড়তে পারেন। এসব সমীকরণের হিসেব কষে বিদ্রোহী প্রার্থীরা এখন পর্যন্ত নির্বাচনী মাঠে এগিয়ে রয়েছেন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
মতামত দিন