প্রধান খবর

কালো টাকার ছড়াছড়ি, বাড়ছে শঙ্কা

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর মাত্র একদিন বাকি আছে। শেষ সময়ে জয়-পরাজয়ের সমীকরণ বদলে দিতে অনেক প্রার্থীর অনুসারী ও সমর্থকদের কালো টাকা ছড়ানোর অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া প্রকাশ্যে  বিভিন্ন প্রার্থী ও প্রার্থীর সমর্থকদের টাকা বিতরণের নানা ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। এ নিয়ে তুলকালাম শুরু হয়েছে। এছাড়া কালো টাকার ছড়াছড়ি নিয়ে বিভিন্ন প্রার্থীরা প্রকাশ্যে নানা অভিযোগও তুলছেন। ফলে নির্বাচনে কালো টাকার ছড়াছড়ি ও ভোট কেনার নানা অভিযোগ নিয়ে নানা শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জ-২ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী আতাউর রহমান খান আঙ্গুরের পক্ষে তার লোকজনের টাকা বিতরণ করার একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। এতে শহরজুড়ে বেশ আলোচনা সমালোচনার ঝড় উঠেছে। 
ভাইরাল হওয়ার ভিডিও তে দেখা যায়, এই সাইফুল ভাই এই সাইফুল ভাই বলে অনেকে তাকে ডাকছে। এর মধ্যে সাইফুল নামে এক যুবক প্রকাশ্যে ৫০০ টাকা নোটের বান্ডেল বের করে বিভিন্ন অংকের টাকা দিচ্ছেন। এ সময় সাইফুল নামে ওই যুবক টাকা দেওয়ার সময় এক ব্যক্তিকে বলেন, তোর জন্য দুই হাজার টাকা দিলাম। এক হাজার টাকা দিতাম সেখানে দুই হাজার দিছি।  
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ-২ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ও সাবেক সংসদ সদস্য আতাউর রহমান আঙ্গুরের এপিএস সাইফুল ও স্বতন্ত্র প্রার্থী আঙ্গুরের ভাতিজা বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক মাহমুদুর রহমান সুমনের অনুসারী জহির প্রকাশ্যে ভোট কিনতে ভোটারদের টাকা দিচ্ছেন। এ সময় তারা ভোটার তালিকা দেখে দেখে ভোটারদের মাঝে টাকা বিতরণ করছেন বলে নানা অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ-২ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী আতাউর রহমান খান আঙ্গুর দেশকণ্ঠকে বলেন, আমরা কোন ভোট কেনার জন্য টাকা দেইনি। আমার এপিএস সাইফুল মাইক ভাড়া ও রিকশা ভাড়া বাবদ টাকা দিচ্ছিল। এ সময় কয়েকজন সাংবাদিক সেই টাকা দেওয়ার ভিডিও ধারণ করে ছেড়ে দিয়েছে। তাছাড়া নির্বাচনী আচারণ বিধিতে উল্লেখ্য আছে, আমি নির্বাচনী কাজের জন্য টাকা খরচ করতে পারবো। 
এর আগে, গত ৩১ জানুয়ারী নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লা দেলপাড়া লিটল জিনিয়াস স্কুল অ্যান্ড কলেজের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের বিএনপি জোটের প্রার্থী মুফতি মনির হোসাইন কাসেমীর টাকা বিতরণের একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। এছাড়া একই প্রতিষ্ঠানে নির্বাচনী প্রচারণা চালানোর অভিযোগে দেড় লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। 
ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, দেলপাড়া লিটল জিনিয়াস স্কুল অ্যান্ড কলেজের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের বিএনপি জোটের প্রার্থী মুফতি মনির হোসাইন কাসেমী বিজয়ীদের মাঝে পুরষ্কার বিতরণ করছেন। পুরষ্কারের সাথে এক হাজার টাকার দুটি করে নোট দিচ্ছেন তিনি। এ সময় প্রার্থী কাসেমীর পাশে থাকা এক ব্যক্তি টাকা গ্রহণ করা ব্যক্তিদের কাসেমী কে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান। এছাড়া ওই অনুষ্ঠানে মাইকে প্রকাশ্যে প্রার্থী কাসেমীকে ভোট দেওয়ার প্রচারণা চালানো হয়। 
এদিকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নির্বাচনী প্রচারণার ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিকেলে সদর উপজেলার সহকারী কমিশনার ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট আসাদুজ্জামান ন‚র মোবাইল কোর্ট অভিযান পরিচালনা করে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের বিএনপি জোটের প্রার্থী মুফতি মনির হোসাইন কাসেমী দেড় লক্ষ টাকা জরিমানা করেন। 
অভিযান পরিচালনার বিষয়ে জানা যায়, দেলপাড়া লিটল জিনিয়াস স্কুল এন্ড কলেজ এর বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ও পুরস্কার বিতরনী অনুষ্ঠানে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম এর প্রার্থী মনির হোসাইন কাসেমী (খেজুর গাছ প্রতীক) শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করে নির্বাচনী প্রচারণা করে যা সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা সুস্পষ্ট লঙ্ঘণ। এ ঘটনায় প্রার্থীর উপস্থিত প্রতিনিধিকে এক লক্ষ পঞ্চাশ হাজার টাকা জরিমানা সহ আদায় করা হয়।
জরিমানা ও টাকা বিতরণের বিষয়ে জানতে চাইলে সহকারী রিটার্নিং অফিসার ও সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম ফয়েজ উদ্দিন বলেন, স্কুল প্রতিষ্ঠানে নির্বাচনী প্রচারণা করা ও উপঢৌকন প্রদান করার একটি ভিডিও পেয়েছি। এ ঘটনায় তাকে দেড় লক্ষ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। 
তিনি আরও বলেন, টাকা বিতরণের ভিডিওটি নির্বাচনী অনুসন্ধ্যান টিমকে দেওয়া হয়েছে। তারা এ বিষয়টি যাচাই বাছাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।
তবে এই ঘটনার পর টাকা বিতরণের বিষয়টি অস্বীকার করে মুফতি মনির হোসাইন কাসেমী বলেন, ‘ আমি সেই অনুষ্ঠানের অতিথি ছিলাম। অনুষ্ঠানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে পুরষ্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে অর্থ দেওয়া হয়। সেই পুরষ্কার প্রদান করার ভিডিও ধারণ করে তা পরবর্তীতে ভাইরাল করা হয়। তবে সেই টাকা ভোটারদের উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়নি।
এদিকে গত ৯ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে কালো টাকার ছড়াছড়ি ও অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার বেড়েছে বলে নানা অভিযোগ তুলেন জোটের প্রার্থী মুফতি মনির হোসাইন কাসেমী। তিনি বলেন, “রিউমার আছে কিছু। আমি চোখে দেখিনি। কিন্তু কালো টাকার ছড়াছড়ি হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দৃষ্টি আকর্ষণ করবো। টাকার ছড়াছড়ি হলে তখন আর ফেয়ার ইলেকশন থাকে না।”
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আসন্ন নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ জেলার পাঁচটি আসনের ৪৮ জন প্রার্থী ভোটের মাঠে রয়েছেন। এর মধ্যে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, সহ বিভিন্ন রাজনীতিক দলের প্রার্থী রয়েছে। তবে আওয়ামী লীগ দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ রয়েছে। ফলে দলটি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারেনি। এছাড়া এক সময় আওয়ামী লীগের সাথে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা জাতীয় পার্টি দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ না হলেও দলটির প্রার্থীদের সেভাবে মাঠে দেখা যাচ্ছেনা। এ জেলায় একজন জাতীয় পার্টির প্রার্থী থাকলেও সর্বশেষ তিনি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন। ফলে এ জেলায় দলটির সেভাবে কোন কার্যক্রম দেখা যাচ্ছেনা। ফলে দীর্ঘদিন পর এ জেলার ৫টি আসন পুনরুদ্ধার করতে চাইছে বিএনপি ও জামায়াত জোটের প্রার্থীরা। ফলে আসন্ন নির্বাচনটি তাদের জন্য রীতিমত প্রেসটিজ ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। 
এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে ইসলামী আন্দোলনের হাতপাখা প্রতীকের প্রার্থী মুফতী ইসমাইল সিরাজী বলেন, এই আসনে কালো টাকা ছড়ানো হচ্ছে। আমাদের নেতাকর্মী সমর্থকদের হুমকী ধমকী দেয়া হচ্ছে। তবে আমরা কোন রক্তচক্ষুকে ভয় পাইনা।
নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে গণসংহতি আন্দোলন মনোনীত মাথাল প্রতীকের প্রার্থী তারিকুল ইসলাম সুজন বলেছেন, নির্বাচনের সময়ে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব হচ্ছে সব প্রার্থী ও ভোটারের জন্য সমান নিরাপত্তা ও সুযোগ নিশ্চিত করা। কিন্তু আমরা লক্ষ্য করছি, বন্দর থানার ওসি একটি বিশেষ প্রার্থীর পক্ষে সক্রিয় ভ‚মিকা পালন করছেন। এতে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে ভয় ও শঙ্কা তৈরি হচ্ছে।

মতামত দিন

বিজ্ঞপ্তি
সবার আগে সব খবর পেতে ভিজিট করুন - voiceofnarayanganj.com I যে কোন সংবাদ বা বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন - 01963958226 / 01819136738 অথবা মেইল করুন - voiceofnarayanganj24@gmail.com