মান্নান ঘনিষ্টদের কেন্দ্রে বিএনপির ভরাডুবির নেপথ্যে
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ-৩ (সোনারগাঁ-সিদ্ধিরগঞ্জ) আসনে সোনারগাঁ উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মোশারফ হোসেন, পৌর বিএনপির সভাপতি শাহজাহান মিয়া, সাধারণ সম্পাদক মোতালেব হোসেন, নারায়ণগঞ্জ জেলা যুবদলের সাবেক সহ-সভাপতি হারুন অর রশিদ মিঠু, উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক নিজামউদ্দিন, মোগরাপাড়া ইউনিয়ন যুবদলের আহবায়ক বাবুল হোসেন, যুবদল নেতা রাকিব হোসেনের কেন্দ্রে ভরাডুবি হয়েছে বিএনপির।
স্থানীয়দের দাবি, অব্যাহত চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব, টাকার বিনিময়ে বিচার শালিসসহ নানা অপকর্মের কারনে মানুষ তাদের কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। ৫ই আগষ্টের পর শেখ হাসিনা পতনের পর এসব নেতারা বিএনপির মনোনীত প্রার্থী আজহারুল ইসলাম মান্নানের ঘনিষ্ট হিসেবে বিভিন্ন স্থানে প্রভাব বিস্তার শুরু করে। তারা বিভিন্ন কারখানায় জুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রন, মানুষকে বিভিন্নভাবে হয়রানী ও টেন্ডারবাজিতে জড়িয়ে পড়ে। এসব বিতর্কিতদের বয়কট করে।
স্থানীয়রা জানায়, সোনারগাঁ উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মোশারফ হোসেন ৫ আগষ্টের পর তার গুটি কয়েক নেতাকর্মী নিয়ে বিভিন্নস্থানে চাঁদাবাজি শুরু করে। চাঁদাবাজির টাকায় ৪ তলা বিশিষ্ট একটি ২৪শ স্কয়ার ফিট বাড়ি নির্মাণ করেন। পাশাপাশি দখলদারিত্বে পাকা হয়ে উঠেন তিনি। প্রয়াত অভিনয় শিল্পী পারভীন সুলতানা দিতির বাড়ি দখলেও সে ব্যস্ত হয়ে উঠেন। তার অনুসারী বিএনপি নেতা সোহেলের নেতৃত্বে পারভীন সুলতানা দিতির মেয়ে লামিয়া চৌধুরীকে মারধর করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়। মোশারফ হোসেন সোনারগাঁ পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে তিনি ভোট প্রদান করেন। তার কেন্দ্রে জামায়াত প্রার্থী ড. মাওলানা ইকবাল হোসেন বিএনপি প্রার্থীকে ২২৯ ভোটে ধরাশায়ী করেন। জামায়াত প্রার্থী মো. ইকবাল হোসাইন ভ‚ঁইয়া ৭৮৪ ভোট পান। বিএনপি প্রার্থী মান্নান পেয়েছেন ৫৫৫ ভোট।
অপরদিকে সোনারগাঁ পৌর বিএনপির সভাপতি শাহজাহান মিয়ার একটি নৃত্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়। এক সময় রেজাউল করিমের অধ্যায়ের সোনারগাঁ থানার অলিখিত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন এ শাহাজাহান। বতর্মানেও সেই পুরানো চেহেরা ফিরিয়ে দিতে চেষ্টা তদবির চালিয়ে যাচ্ছে। মোশারফ হোসেন ও শাহজাহান এ দুজন গুরুত্বপ‚র্ন পদে থেকেও সোনারগাঁ পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে আহজারুল ইসলাম মান্নানকে জয় উপহার দিতে পারেননি।
সাধারণ ভোটারদের দাবি, গুরুত্বপ‚র্ন পদে আসীন মোতালেব হোসেন ও তার ভাই জাহের আলী। মোতালেব হোসেন পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও তার ভাই জাহের আলী পৌর যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহবায়ক। তাদের আরো দুই ভাই হুমায়ুন ও লিটন চৈতি গার্মেন্ট এলাকায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদাবাজি, দখলবাজি, মহাসড়কের ছিনতাইয়েরও নেতৃত্বও দিয়ে থাকেন। পুলিশের চোঁখ আড়াল করে হুমায়ুন ও লিটনের বাহিনী ছিনতাইয়ে জড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে প্রবাস ফেরত যাত্রীদের টার্গেট করে তারা ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটিয়ে থাকে। দিনে তারা সাধু, রাতে ছিনতাইকারী। তারা গত কয়েক বছর ধরে মান্নানের ঘনিষ্ট হয়ে উঠে। তাদের কেন্দ্র গোয়ালদী সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ২৪৬ ভোট পরাজিত হয় বিএনপির আজহারুল ইসলাম মান্নান। এসব বিতর্কিত নেতাদের কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
তাদের দাবি, নিজের বাড়ি নির্মাণ করতে হলেও চাঁদা দিতে হয়েছে মোতালেব হোসেন ভাই হুমায়ুনকে। এছাড়াও সাবেক এমপি রেজাউল করিমের ওরা ১১ জনের অন্যতম সদস্য সালাউদ্দিনের ছেলে হারুন অর রশিদ মিঠু, ওমর ফারুক টিটু ও ওসমান গণি লিটু বিএনপির রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে নিষ্কৃয় থাকার পর ৫ই আগষ্টে হঠ্যাৎ দলে ভীড়ে। ওমর ফারুক টিটু সাবেক সাংসদ লিয়াকত হোসেন খোকার জাতীয় স্বেচ্ছাসেবক পার্টির পৌরসভার সভাপতি হিসেবে দীর্ঘদিন রাজনীতি করেছেন। ওই সময়ে বিএনপিসহ বিভিন্ন মানুষকে মামলা দিয়ে হয়রানী করেছেন এ টিটু। এছাড়াও তার ছোট ভাই লিটুও বিএনপির রাজনীতিতে তার কোন অবদান নেই।
শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার পর মান্নানকে বাড়িতে দাওয়াত খাইয়ে তার ঘনিষ্ট হয়ে উঠে। এর পর থেকে বিভিন্ন অপকর্মে জড়িয়ে পড়ে। বিতর্কিত মোগরাপাড়া ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান ও পৌর বিএপির সাধারণ সম্পাদক মোতালেব হোসেনের নেতৃত্বে ৩০-৩৫ জনের একটি সিন্ডিকেট মেঘনা ইকোনোমিক জোনের প্রতিটি কারখানা দখল করে ঝুট ব্যবসা নিয়ন্ত্র করে যাচ্ছে। মানুষ তাদের অপকর্মে অতিষ্ট হয়ে বিএনপিকে ভোট না দেওয়ায় গোয়ালদী কেন্দ্রে পরাজিত হয় বিএনপি।
অপরদিকে মোগরাপাড়া ইউনিয়নে বাড়ি মজলিশ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট দিতে ভোটারদের কাছে ভোট প্রার্থনা করেন বিতর্কিত নেতা নিজামউদ্দিন। নির্বাচনী সভায় ভোটারদের হুমকিও দিয়েছেন। সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফেসবুকে ভাইরাল হয়। বিভিন্ন পত্র পত্রিকা ও টিভি চ্যানেলে সংবাদ প্রকাশ হলেও তার বিরুদ্ধে প্রশাসনের কোন ব্যবস্থা না নেওয়ায় সেখানে জামায়াত প্রার্থীকে ভোট দেয় ভোটাররা। মুখ ফিরিয়ে নেয় বিএনপির প্রার্থীর প্রতীক থেকে। এছাড়াও নিজামউদ্দিন, শামীম, বাবুল মোগরাপাড়া চৌরাস্তা এলাকায় আতাউর রহমানের চাঁদাবাজির সহযোগী হিসেবে দীর্ঘদিন চাঁদা উত্তোলনের বিষয়টি সবার কাছে উন্মুক্ত হয়ে উঠে। ফলে তাদের কথা ভোট দেয়নি বিএনপিকে।
মোগরাপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ন‚রে আলাম (নুরুল্লাহ) শেখ হাসিনা পতনের পর আতাউর সিন্ডিকেটে জড়িয়ে পড়ে। ওই সময়ে ইউএও ফারজানা রহমানের সঙ্গে আতাঁত করে মোগরাপাড়া চৌরাস্তায় ভাঙ্গা গড়ার খেলায় মেতেছেন। ভেঙ্গে দেওয়ার দোকানপাট পুনরায় বসানোর নাম করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে কোটি টাকার বানিজ্য করেছেন। এছাড়াও তার এলাকায় সে সাধারণ মানুষকে হয়রানীতে রেখেছেন। ফলে বিএনপির আজহারুল ইসলাম মান্নানকে কাঙ্খিত ভোট দেয়নি। কালিগঞ্জ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে জামায়াত প্রার্থী ইকবাল হোসাইন ভ‚ঁইয়া ৪৪৯ ভোট পেয়ে জয়ী হয়। পরাজিত হন বিএনপি নেতা আজহারুল ইসলাম মান্নান।
সার্বিকভাবে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী আজহারুল ইসলাম মান্নান সাংসদ নির্বাচিত হন। কিন্তু এসব নেতাদের সঙ্গ ত্যাগ করতে না পারলে হয়তো তিনি আগামী দিনে নেতৃত্বে কলঙ্কিত হতে পারেন বলে সাধারণ মানুষ দাবি করেছেন।
মতামত দিন