প্রধান খবর

নগর ভবনের দুর্দান্ত ক্ষমতাবান থেকে কারাবন্দি আইভী

এক সময়ের দুর্দান্ত ক্ষমতাবান ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী টানা ২১ বছর নারায়ণগঞ্জ সিটি করপেরেশন ও পৌরসভার চেয়ারের দায়িত্ব পালন করেছেন। তার দুর্দান্ত ক্ষমতা ও জনপ্রিয়তার কাছে বারবার পরাস্ত হয়েছেন তৎকালীন সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা শামীম ওসমান। এতে জনগণের আস্থা কুড়িয়েছেন তিনি। তবে জুলাই বিপ্লবের আন্দোলনের পর আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ও জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সিনিয়র সহ সভাপতি ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীকে গত বছরের ৯ মে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের হত্যা মামলায় গ্রেফতার করা হয়। এরপর দফায় দফায় তাকে আরও বিভিন্ন মামলায় শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানো হয়। সেই থেকে এখন পর্যন্ত তিনি গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারে বন্দি জীবন যাপন করছেন। 
তবে এ বিষয়ে ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর আইনজীবীরা বরাবর বলে আসছেন, সাবেক মেয়র আইভীকে জুলাই আন্দোলনের বিভিন্ন মামলায় ফাঁসানো হচ্ছে। তিনি কোথাও কোন হামলা করেননি, সে প্রমাণ কেউ দিতে পারবেনা। 
জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সিটি করপোরেশনের মেয়র পদ বিলুপ্ত করার পর থেকে বাড়িতে অবস্থান করছিলেন সেলিনা হায়াৎ আইভী। ২০২৫ সালের ৮ মে রাত সাড়ে ১১টার দিকে সাবেক এ মেয়রের বাড়ির সামনে অবস্থা নেয় পুলিশ। খবর পেয়ে বাড়ির বাইরে অবস্থা নেয় এলাকাবাসী। পরে সড়ক অবরোধ করে এলাকাবাসী বিক্ষোভ শুরু করে বাড়ির চারপাশে ঘিরে রাখে।
এরপর বিপুল সংখ্যক পুলিশের একটি বহর সেলিনা হায়াৎ আইভীর বাড়িতে আসে। এসময় আশপাশের মসজিদগুলোতে পুলিশ আসার খবর ছড়িয়ে পড়লে শতশত মানুষ এসে কয়েকটি স্থানে ব্যারিকেড দিয়ে সড়ক অবরোধ করে। পরের দিন শুক্রবার ভোরে সাবেক মেয়র আইভীকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায় পুলিশ।
গ্রেপ্তারের সময় সেলিনা হায়াৎ আইভী সাংবাদিকদের বলেন, ‘পুলিশ গ্রেপ্তারি পরোয়ানা না দেখিয়ে তাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু বলা যদি অপরাধ হয়ে থাকে তাহলে আমি অপরাধী। কিন্তু নারায়ণগঞ্জে ২১ বছরের সেবায় কোনো দল কিংবা ব্যক্তিকে আঘাত করার মতো কিছু কখনো করিনি। যখনি নারায়ণগঞ্জে হত্যাকাÐ ঘটেছে তখনি প্রতিবাদ করেছি।’
এদিকে সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়ার সময় শহরের বি বি রোডের কালির বাজার এলাকায় দুর্বৃত্তরা পটকা ফুটিয়ে তাকে নিয়ে যাওয়া গাড়ির বহরে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে।
ওই দিন (৯ মে) বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সংঘটিত একটি হত্যা মামলায় গ্রেফতার হওয়ার পর থেকে প্রায় ১০ মাস ধরে আইভীকে গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগারে রাখা হয়। পরে আরও চারটি মামলায় শ্যোন অ্যারেস্ট দেখায় পুলিশ। গত ৯ নভেম্বর হাইকোর্টের বিচারপতি এ এস এম আবদুল মোবিন ও বিচারপতি মো. সগীর হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ আইভীকে পাঁচটি মামলায় জামিন দেন। এরপর ফের নতুন করে আরও পাঁচটি মামলায় তাকে শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানো হয়। 
শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানো মামলাগুলো হলো- ফতুল্লায় জুলাই আন্দোলনের সময় বাসচালক আবুল হোসেন হত্যা মামলা, ইয়াছিন হত্যা মামলা, আব্দুর রহমান হত্যা মামলা ও পারভেজ হত্যা মামলা। অপর মামলাটি পুলিশের ওপর হামলা ও সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে করেছিল সদর মডেল থানা পুলিশ।
আইভীর আইনজীবী আওলাদ হোসেন বলেন, মিথ্যা ও হয়রানিম‚লক মামলায় সাবেক মেয়র আইভী জেলহাজতে আটক আছেন। তিনি নারায়ণগঞ্জের একজন পরিচ্ছিন্ন, সৎ এবং আদর্শবাদী মেয়র ও রাজনীতিক। উচ্চ আদালত পাঁচটি মামলায় তাঁর জামিন দেওয়ার পর বিরোধী পক্ষ তাঁকে হয়রানি করার জন্য তৎপর আছে। তাঁকে মিথ্যা মামলায় সম্পৃক্ত করার চেষ্টা চলছে।
সাবেক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী দীর্ঘ ২১ বছর পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের চেয়ারম্যান ও মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
জানা গেছে, ২০০৩ সালে অনুষ্ঠিত পৌর চেয়ারম্যান নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে জয়লাভ করে নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার প্রথম নারী চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন আইভী। পরে ২০১১ সালে নারয়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনে নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে তিনি মেয়র হিসেবে জয়লাভ করেন। ওই নির্বাচনে প্রভাবশালী শামীম ওসমানকে বিপুল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করে তিনি দুর্দান্ত দাপটে ছিলেন।
 পরে ২০১৬ সালে দ্বিতীয় ও ২০২২ সালে তৃতীয় দফায় নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলীয় নৌকা প্রতিক নিয়ে লড়াই করে জয়লাভ করেন ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। এছাড়া তিনি প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদাও পেয়েছিলেন। ফলে টানা তিন মেয়াদে সিটি করপোরেশনের মেয়র ও এক মেয়াদে পৌরসভার চেয়ারম্যান পদে আসিন থেকে দুর্দান্ত ক্ষমতাবান হয়ে উঠেন তিনি। তার এক কথায় সিটি করপেরেশনের বড় বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো। এমনকি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গুডবুকে থাকার ফলে দুর্দান্ত দাপটের সাথে ক্ষমতার সংমিশ্রণে এক অপরাজেয় শক্তিতে পরিণত হন আইভী। 
তবে ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে ওই বছরের ১৯ আগস্ট নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন সহ দেশের ১২টি সিটি করপোরেশনের মেয়রকে অপসারণ করে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়। এতে ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীকে মেয়র পদ থেকে অপসারণ করা হয়।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সাবেক মেয়র আইভীর সাথে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের বিরোধী ছিল। এছাড়া তার সাথে সেভাবে আর কারও বিরোধ দেখা যায়নি। সেসময় নগর ভবনের কাজ নিয়ে তাকে বেশ ব্যস্ত সময় পার করতে দেখা গেছে। তবে দীর্ঘ ২১ বছরের মেয়র ও চেয়ারম্যানের পদ ছেড়ে এবার তিনি কারাবন্দি জীবন যাপন করছেন।

মতামত দিন

বিজ্ঞপ্তি
সবার আগে সব খবর পেতে ভিজিট করুন - voiceofnarayanganj.com I যে কোন সংবাদ বা বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন - 01963958226 / 01819136738 অথবা মেইল করুন - voiceofnarayanganj24@gmail.com