বিদেশে শামীম কারাগারে আইভী
নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে দুই মেরুর দুই প্রভাবশালী নেতা-নেত্রীর পথ জুলাই বিপ্লবের পর আরও ভিন্ন হয়ে গেছে। এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগের নেতা শামীম ওসমান দেশ ছেড়ে বিদেশে অবস্থান করছেন। অন্যদিকে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের হত্যা সহ একাধিক মামলায় গ্রেফতার হয়ে কারাগারে রয়েছেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ও জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ সভাপতি ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। দুই মেরুতে থাকা এই দুই নেতৃবৃন্দর পথও ভিন্ন হয়ে গেছে। একজন রাজনীতিতে অনড় অবস্থানে থেকে কারা জীবন-যাপন করছেন, অন্যজন নেতাকর্মীদের রেখে বিদেশে জীবন যাপন করছেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর দলের সিনিয়ন নেতৃবৃন্দরা দেশ ছেড়ে বিদেশে অবস্থান করছেন। এই অবস্থায় দলের হাল ধরতে দেশে অবস্থান করা বেশ কয়েকজন নেতৃবৃন্দের নাম উঠেছে। সেই তালিকায় নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর নাম উঠে আসে। এতে তাকে টার্গেট করা হয়।
জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতন হলে আওয়ামী লীগ দলটির প্রধান শেখ হাসিনা সহ সিনিয়ন নেতৃবৃন্দরা দেশ ছেড়ে অন্যত্র চলে যান। সে সময় নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা শামীম ওসমান দেশ ছেড়ে প্রথমে ভারতে পাড়ি জমায়। ওই সময় তার পরিবারের সদস্যদেরও তার সাথে দেখা যায়। পরে সেখান থেকে তিনি সপরিবারে ডুবাই চলে যান। অথচ তার দলের নেতাকর্মীরা এখনো দেশে রয়েছেন। এতে প্রশ্ন উঠেছে- দলের নেতাকর্মীদের ছেড়ে এই দুঃসময়ে শামীম ওসমান বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন। অথচ তার নেতাকর্মীরা হামলা ও মামলার শিকার হয়ে জেল হাজতে রয়েছে, কেউ কেউ আবার আত্মগোপনে রয়েছেন।
দলীয় সূত্রে বলছে, ২০০১ সালে আওয়ামী লীগ সরকার নির্বাচনে পরাজিত হলে সে সময়ও শামীম ওসমান দেশ ছেড়ে পালিয়ে বিদেশ চলে যান। দীর্ঘদিন দেশের বাইরে অবস্থান করেছেন। পরে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ফের ক্ষমতায় আসলে ফের দেশে ফেরেন শামীম ওসমান। পরে ২০১৪ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। পরে টানা তিন মেয়াদে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব পালন করেন শামীম ওসমান।
অন্যদিকে জুলাই বিপ্লবের পর আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলেও নিজ বাড়িতে অবস্থান করেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ও জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ সভাপতি ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। এরপরও তিনি নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়রের দায়িত্ব পালন করেন। ওই বছরের ১৯ আগস্ট নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন সহ দেশের ১২টি সিটি করপোরেশনের মেয়রকে অপসারণ করে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়। এতে ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীকে মেয়র পদ থেকে অপসারণ করা হয়। সেই থেকে তিনি নিজ বাড়িতে অবস্থান করছিলেন।
এদিকে খবর ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে আসছেন সাবেক রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ ও সাবেক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। এই খবরে পুলিশ প্রশাসন নড়ে চড়ে বসে। এর মধ্যে ২০২৫ সালের ৮ মে রাত সাড়ে ১১টার দিকে সাবেক এ মেয়রের বাড়ির সামনে অবস্থা নেয় পুলিশ। খবর পেয়ে বাড়ির বাইরে অবস্থা নেয় এলাকাবাসী। পরে সড়ক অবরোধ করে এলাকাবাসী বিক্ষোভ শুরু করে বাড়ির চারপাশে ঘিরে রাখে। এতে আইভীর জনপ্রিয়তার বিষয়টি টের পায় সকলে।
এরপর বিপুল সংখ্যক পুলিশের একটি বহর সেলিনা হায়াৎ আইভীর বাড়িতে আসে। এসময় আশপাশের মসজিদগুলোতে পুলিশ আসার খবর ছড়িয়ে পড়লে শতশত মানুষ এসে কয়েকটি স্থানে ব্যারিকেড দিয়ে সড়ক অবরোধ করে। পরের দিন শুক্রবার ভোরে সাবেক মেয়র আইভীকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায় পুলিশ।
গ্রেপ্তারের সময় সেলিনা হায়াৎ আইভী সাংবাদিকদের বলেন, ‘পুলিশ গ্রেপ্তারি পরোয়ানা না দেখিয়ে তাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু বলা যদি অপরাধ হয়ে থাকে তাহলে আমি অপরাধী। কিন্তু নারায়ণগঞ্জে ২১ বছরের সেবায় কোনো দল কিংবা ব্যক্তিকে আঘাত করার মতো কিছু কখনো করিনি। যখনি নারায়ণগঞ্জে হত্যাকান্ড ঘটেছে তখনি প্রতিবাদ করেছি।’
এদিকে সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়ার সময় শহরের বি বি রোডের কালির বাজার এলাকায় দুর্বৃত্তরা পটকা ফুটিয়ে তাকে নিয়ে যাওয়া গাড়ির বহরে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে।
ওই দিন (৯ মে) বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সংঘটিত একটি হত্যা মামলায় গ্রেফতার দেখানোর পর থেকে প্রায় ১০ মাস ধরে আইভীকে গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগারে রাখা হয়। পরে আরও চারটি মামলায় শ্যোন অ্যারেস্ট দেখায় পুলিশ। গত ৯ নভেম্বর হাইকোর্টের বিচারপতি এ এস এম আবদুল মোবিন ও বিচারপতি মো. সগীর হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ আইভীকে পাঁচটি মামলায় জামিন দেন। এরপর ফের নতুন করে আরও পাঁচটি মামলায় তাকে শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানো হয়।
শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানো মামলাগুলো হলো- ফতুল্লায় জুলাই আন্দোলনের সময় বাসচালক আবুল হোসেন হত্যা মামলা, ইয়াছিন হত্যা মামলা, আব্দুর রহমান হত্যা মামলা ও পারভেজ হত্যা মামলা। অপর মামলাটি পুলিশের ওপর হামলা ও সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে করেছিল সদর মডেল থানা পুলিশ।
এদিকে গত ২৬ ফেব্রুয়ারী দুপুরে উচ্চ আদালতে থেকে বাকি ৫টি মামলায় জামিন পান আইভী। তবে এর মধ্যে সিদ্দিরগঞ্জে আরও একটি হত্যা মামলায় শ্যেন অ্যারেস্ট দেখানো হয় আইভীকে।
মামলা স‚ত্রে জানা গেছে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় সংগঠিত সহিংসতার ঘটনায় ২০২৪ সালের ২০ জুলাই চিটাগাংরোড এলাকায় ডাচ বাংলা ব্যাংকের নিচে আগুনে পুড়ে নিহত হন ইন্টিরিয়র মিস্ত্রি সেলিম মন্ডল। এ ঘটনায় ২০২৫ সালের ৩০ জুন কৃষক ওয়াজেদ আলী বাদি হয়ে ইন্টিরিয়র মিস্ত্রি সেলিম মন্ডলকে পুড়িয়ে হত্যার অভিযোগে সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন।
এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তারেক আল মেহেদী বলেন, আরও একটি মামলায় তাকে শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানো হয়েছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় ইন্টিরিয়র মিস্ত্রি সেলিম মÐল হত্যা মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। আইভী বর্তমানে কারাগারে রয়েছে। ফলে আদালতের নির্দেশে এ মামলায় তাকে শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানো হয়েছে।
জানা গেছে, ২০০৩ সালে অনুষ্ঠিত পৌর চেয়ারম্যান নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে জয়লাভ করে নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার প্রথম নারী চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন আইভী। পরে ২০১১ সালে নারয়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনে নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে তিনি মেয়র হিসেবে জয়লাভ করেন। ওই নির্বাচনে প্রভাবশালী শামীম ওসমানকে বিপুল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করে তিনি দুর্দান্ত দাপটে ছিলেন। সেই থেকে শামীম ওসমানের সাথে প্রকাশ্য চরম দ্ব›দ্ব ও কোন্দাল শুরু হয় শামীম ও আইভীর মধ্যে। পরে ২০১৬ সালে দ্বিতীয় ও ২০২২ সালে তৃতীয় দফায় নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলীয় নৌকা প্রতিক নিয়ে লড়াই করে জয়লাভ করেন ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। এছাড়া তিনি প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদাও পেয়েছিলেন।
স্থানীয় ও দলীয় সূত্র বলছে, ২০১১ সালের নাসিক নির্বাচন থেকে প্রকাশ্যে শামীম ও আইভীর মধ্যে চরম দ্ব›দ্ব কোন্দল শুরু হয়। পরে বেশ কয়েক দফায় এ বিরোধ মিটমাট করার অনেক চেষ্টা করা হলে তা কাজে আসেনি। ফলে নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগের রাজনীতিও দুই ভাবে বিভক্ত ছিল। এমনকি আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পরও তারা দুজন ভিন্ন পথে হেঁটেছেন। তবে দেশে অবস্থান করায় নেতাকর্মীদের প্রশংসা কুড়িয়েছেন আইভী। সেই সাথে নেতাকর্মীদের আস্থা অর্জন করেছেন তিনি।
মতামত দিন