নিয়োগ নেই, পদ-পদবি নেই, তবু ভ্যাট কর্মকর্তার ভূমিকায় আশরাফুল
কোনো নিয়োগ নেই, নেই নির্ধারিত পদ-পদবি কিংবা অফিসে বসার জন্য নির্দিষ্ট টেবিল-চেয়ার। অথচ নারায়ণগঞ্জের কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কার্যালয়ে কর্মকর্তার মতোই অবাধ বিচরণ তাঁর। ভ্যাটসংক্রান্ত সেবা নিতে আসা ব্যক্তিদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের তালিকা বুঝিয়ে দেওয়া, প্রাথমিক কথাবার্তা বলা, এমনকি ভ্যাট কর্মকর্তাদের সঙ্গে অভিযানে যাওয়ারও অভিযোগ উঠেছে আশরাফুল নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, ভ্যাট কার্যালয়ের কিছু অসাধু কর্মকর্তার সঙ্গে সক্ষতার সুযোগ নিয়ে তিনি গ্রাহকদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করেন এবং ঘুষ লেনদেনের মধ্যস্থতা করেন। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আশরাফুলের দাবি, তিনি শুধু অফিসে চা ও নাশতা সরবরাহ এবং বাজারসদাইয়ের কাজ করেন।
সরেজমিনে নারায়ণগঞ্জ ভ্যাট কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, ভ্যাটসংক্রান্ত তথ্য ও সেবা নিতে আসা ব্যক্তিদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের তালিকা দিচ্ছেন আশরাফুল। কর্মকর্তাদের কাছে যাওয়ার আগে প্রাথমিকভাবে তাঁর সঙ্গেই কথা বলতে হচ্ছে সেবাগ্রহীতাদের। অথচ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি ওই কার্যালয়ের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী নন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আশরাফুলের বাড়ি গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার দক্ষিণ মরুয়াদহ (ধাপাচিলা) গ্রামে। তাঁর বাবার নাম মো. আতোয়ার। তিনি কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাটের এনায়েতনগর সার্কেল কার্যালয়ে যাতায়াত করেন। অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে সেখানে চলাফেরা করতে করতে তিনি এমনভাবে নিজেকে উপস্থাপন করছেন, যেন ওই কার্যালয়েরই একজন কর্মকর্তা। কখনো কখনো ভ্যাট কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাঁদের ব্যবহৃত পোশাক পরে বিভিন্ন স্থানে অভিযানে যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, ভ্যাট কার্যালয়ের কিছু কর্মকর্তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে আশরাফুল সেখানে প্রভাব বিস্তার করার সুযোগ পেয়েছেন। ভ্যাটসংক্রান্ত বিভিন্ন কাজ করিয়ে দেওয়ার কথা বলে সেবাগ্রহীতাদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং অনিয়মের আর্থিক লেনদেনে মধ্যস্থতা করার অভিযোগও উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তি জানান, প্রায় চার-পাঁচ বছর আগে অফিসের বাজারসদাই করা এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের খাবার পরিবেশনের জন্য আশরাফুলকে এনায়েতনগর সার্কেল কার্যালয়ে আনা হয়েছিল। সে সময় অফিসের প্রধানের সঙ্গে কথা বলেই তাঁকে এই কাজে যুক্ত করা হয়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর ভূমিকা বদলে গেছে বলে অভিযোগ ওই ব্যক্তির। তাঁর ভাষ্য, এখন আশরাফুলকে দেখে অনেকেরই মনে হতে পারে, তিনি কাস্টমসের একজন কর্মকর্তা। কার্যালয়ের কিছু কর্মকর্তা তাঁকে বিভিন্ন কাজে সহযোগিতা করার সুযোগ দেওয়ায় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে তাঁর অভিযোগ।
এদিকে আশরাফুলের বিরুদ্ধে আরও কিছু ব্যক্তিগত অনিয়মের অভিযোগও সামনে এসেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য পাওয়া যায়নি। তাই সেগুলো নিশ্চিত ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা যাচ্ছে না।
অভিযোগের বিষয়ে আশরাফুল বলেন, ‘আমি অফিসে চা আনি, বাজারসদাই করি। এ ছাড়া এখানে আমার কোনো কাজ নেই।’ গ্রাহকদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের বিষয়ে কেন তিনি কথা বলেন, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি আবারও বলেন, তিনি শুধু চা আনা ও বাজার করার কাজ করেন। এর বাইরে অফিসে তাঁর কোনো দায়িত্ব নেই।
কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাটের এনায়েতনগর সার্কেলের রাজস্ব কর্মকর্তা গোলাম রাব্বানী বলেন, ‘আশরাফুল আমাদের অফিসের কেউ নন। অফিসে তাঁর কোনো পদ বা দায়িত্ব নেই। তিনি যদি ভ্যাট কর্মকর্তাদের পোশাক পরে কোথাও অভিযানে গিয়ে থাকেন, তাহলে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে সহকারী কমিশনার আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘বিষয়টি আমি শুনেছি। ভালোভাবে তদন্ত করে পরবর্তী সময়ে জানানো হবে।’
ভ্যাট কার্যালয়ে সেবাগ্রহীতাদের সঙ্গে কথা বলা থেকে শুরু করে দাপ্তরিক কাজের পরিধিতে একজন বহিরাগত ব্যক্তির এমন উপস্থিতি কতটা নিয়মসম্মত, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই এবং ভ্যাট কার্যালয়ে অনিয়মের সুযোগ থাকলে তা বন্ধ করতে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
মতামত দিন