প্রধান খবর

কালামের বাজিমাত, সাখাওয়াত-মাসুদে চিন্তার ভাজ

বহু নাটকীয়তার পর নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে বিএনপি দলীয় চূড়ান্ত মনোনয়ন পেয়ে রীতিমত বাজিমাত করেছেন মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আবুল কালাম। এই সংক্রান্ত কেন্দ্রীয় মনোনয়ন পত্রের একটি চিঠি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে চারদিকে আলোচনার ঝড় উঠে। অন্যদিকে এই আসনের প্রাথমিক পর্যায়ের দুজন প্রার্থী শিল্পপতি মাসুদুজ্জামান মাসুদ ও মহানগর বিএনপির আহŸায়ক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানের শিবিরে চিন্তার ভাজ পড়েছেন। দীর্ঘদিন অসুস্থ্যতা ও রাজনীতিতে ব্যাকফুটে থাকার পর দলীয় মনোনয়ন বাগিয়ে এনে আবুল কালাম বিএনপির রাজনীতিতে রীতিমত চমক দেখিয়ে বাজিমাত করেছেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। 
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিন অসুস্থ্য হয়ে বিগত সময়ে রাজনীতি থেকে ব্যাকফুটে ছিলেন আবুল কালাম। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তিনি রাজনীতিতে ফের সক্রিয় হন। এরপর থেকে নির্বাচন করার ঘোষণা দিলেও প্রাথমিক পর্যায়ের দলীয় মনোনয়ন পান মাসুদুজ্জামান মাসুদ। পরে মাসুসুজ্জামান নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিলে রীতিমত চমক দেখিয়ে মনোনয়ন বাগিয়ে নেন সাখাওয়াত হোসেন খান। তবে সেই চমক বেশিদিন ধরে রাখতে পারেনি। এরপর অল্প কিছুদিনের ব্যবধানে বাজিমাত করে বিএনপি দলীয় মনোনয়ন পেয়ে যান আবুল কালাম।
জানা গেছে, বুধবার (২৪ ডিসেম্বর) সকালে আবুল কালামের মনোনয়ন সংক্রান্ত একটি চিঠি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সেই চিঠিতে, বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্বাক্ষরিত একটি আনুষ্ঠানিক ঘোষণাপত্রে তাকে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসন থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। 
বিষয়টি নিশ্চিত করে নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির আহবায়ক অধ্যাপক মামুন মাহমুদ কে বলেন, দল থেকে চ‚ড়ান্ত মনোনয়নের চিঠি তাকে দেওয়া হয়েছে। এরপর দল থেকে তাদেরকে প্রতীক দেওয়া হবে।
এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী অ্যাডভোকেট আবুল কালাম বলেন, দল থেকে আমাকে চ‚ড়ান্ত মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। এজন্য আমি দলের সবার কাছে কৃতজ্ঞ। 
দলের দুজন প্রার্থীর পর আপনার নাম ঘোষণা করা হয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, দল প্রাথমিকভাবে অনেকের নাম ঘোষণা করতে পারে। কিন্তু দল থেকে চ‚ড়ান্ত প্রার্থীর নাম ঘোষণার বিষয়ে আগেই বলে দেয়া হয়েছিল। সেখানে চ‚ড়াান্ত প্রার্থী হিসেবে আমাকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে।
তবে আবুল কালামকে মনোনয়ন দেওয়ার বিষয়টি নাকচ করেছে প্রাথমিক পর্যায়ে মনোনয়ন পাওয়া দুজন প্রার্থী। এ বিষয়ে বিএনপির প্রাথমিক পর্যায়ে মনোনীত প্রার্থী মাসুদুজ্জামান মাসুদ তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টে স্ট্যাটাস দিয়েছেন। সেখানে উল্লেখ করা হয়, সকলেই আস্থা রাখুন, ঐক্যবদ্ধ থাকুন। খুব দ্রæতই সব দ্বিধার সমাধান আসবে। ধানের শীসের পক্ষে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার অনুরোধ জানাচ্ছি। 
বিএনপির আরেক প্রার্থী ও মহানগর বিএনপির আহŸায়ক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান বলেন, ‘কে ফাইনাল এইটা সেন্ট্রাল জানে। সেন্ট্রাল থেকেই চ‚ড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হবে। তখনই আসনটিতে কে চ‚ড়ান্ত প্রার্থী তা সবাই জানতে পারবে।’
এর আগে, গত ২৩ নভেম্বর বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে এ জেলার চারটি আসনে বিএনপির প্রার্থী ঘোষণা করে। যার মধ্যে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে শিল্পপতি মাসুদুজ্জামান মাসুদকে প্রার্থী ঘোষণা করে বিএনপি দলটি। এরপর থেকে ভোট চেয়ে এলাকায় ব্যাপক গণসংযোগ, সভা-সমাবেশ করে আসছিলেন তিনি।
তবে এই আসনে মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন সাবেক সংসদ সদস্য ও মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি আবুল কালাম, মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান, সদস্য সচিব আবু আল ইউসুফ খান টিপু ও বিএনপি নেতা আবু জাফর বাবুল। প্রথম থেকে তারা সবাই মাসুদুজ্জামানের বিরোধীতা করে আসছেন। এর ধারাবাহিকতায় গত ১৫ নভেম্বর নারায়ণগঞ্জ-৫ (শহর-বন্দর) আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী মাসুদুজ্জামান মাসুদের প্রার্থীতা বাতিলের দাবিতে একাট্টা হয়ে এক টেবিলে বসেন এই চার জন মনোনয়ন প্রত্যাশী। ওই দিন নারায়ণগঞ্জ ক্লাবে তারা সকলেই একসাথে বসে সংবাদ সম্মেলন করে তার প্রার্থীতা বাতিলের দাবি করেন। তাদের দাবি, ‘বিগত ১৭ বছর আওয়ামী লীগের ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে তৃণম‚ল সহ অনেকেই নির্যাতিত হয়েছে। এসব তৃণম‚লকে ম‚ল্যায়িত করা হয়নি। তাই এ মনোনয়ন পরিবর্তনের দাবি তোলেন তারা। তাদের মধ্য থেকে যে কোন একজনকে মনোনয়ন দেওয়া হলে তারা সবাই এক হয়ে কাজ করবেন বলে ঘোষণা দেওয়া হয়।’এই ঘটনার মধ্য দিয়ে তারা বিভিন্ন সময় মাসুদুজ্জামানের বিরোধীতা করে নানা বক্তব্য দিয়েছেন।
তবে এই ঘটনার কিছুদিন পর নাটকীয়ভাবে বলয় পরিবর্তন করে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী মাসুদুজ্জামান মাসুদের পক্ষে কাজ শুরু করেন মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব আবু আল ইউসুফ খান টিপু। ওই সময় তিনি মাসুদুজ্জামানের সভা-সমাবেশে ও নির্বাচনী প্রচারণায় বেশ ঘটা করে নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছেন। অন্যদিকে মনোনয়ন বঞ্চিত বাকি তিন জনের বিরোধপ‚র্ণ বক্তব্য অব্যাহত ছিল।
এসব ঘটনার মধ্যে আকষ্মিকভাবে গত ১৬ ডিসেম্বর দুপুরে নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে নিরাপত্তা ইস্যু ও পারিবারিক চাপের কারণে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মাসুদুজ্জামান মাসুদ।
তবে এই ঘটনার পর থেকে মাসুদুজ্জামান বলয়ের নেতাকর্মী, অনুসারী ও সমর্থকরা ক্ষোভ প্রকাশ করে তার সিদ্ধান্ত বদলের দাবি জানিয়ে আসছিল। সর্বশেষ তিনি সিদ্ধান্ত বদল না করলে মাসুদুজ্জামানের বাড়ি ও ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান ঘেরাও করার ঘোষণা দিয়েছেন তারা। এর ফলশ্রæতিতে গত শুক্রবার (১৯ ডিসেম্বর) বিকেলে সিদ্ধান্ত বদল করে নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়েছেন মাসুদুজ্জামান মাসুদ। 
এদিকে এই ঘটনার মাত্র এক দিনের ব্যবধানে শনিবার (২০ ডিসেম্বর) নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের পক্ষ থেকে প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন জেলা মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান। অন্যদিকে মাসুদুজ্জামান মাসুদ এই আসনে এখনো তিনি নিজেকে বিএনপির প্রার্থী বলে দাবি করে আসছেন। এর ধারাবাহিকতায় গত কিছুদিন ধরে এই দুজন প্রার্থী বিভিন্ন এলাকায় একে নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়ে আসছেন।
জানা গেছে, বিএনপি প্রতিষ্ঠাকালে জিয়াউর রহমানের সাথে ছিলেন আবুল কালামের পিতা হাজী জালালউদ্দিন আহম্মেদ। তিনি নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। তার সূত্র ধরে ও বিএনপি আদর্শে গড়া আবুল কালামকে ১৯৯১ সাল থেকে টানা ছয় বার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী করা হয়। এতে তিনি শহর-বন্দরের মানুষের ভোটে তিনবার এমপি নির্বাচিত হয়ে উন্নয়নে ছিলেন প্রশংসিত। আবুল কালাম ক্লিন ইমেজে রাজনীতি কারণে তার কোন নিজস্ব বাহিনী বা বলয়ে নেই। যার কারণে শহর-বন্দরের মানুষের মধ্যে এখনো তার জনপ্রিয়তা রয়েছে তুঙ্গে। ফলে তাকে নিয়ে নানা আলোচনা চলছে শহরজুড়ে।
তবে এই আসনের একের পর এক মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মনোনয়ন দেওয়াকে কেন্দ্র করে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে নেতাকর্মীদের মধ্যে। ফলে সর্বশেষ আবুল কালামকে মনোনয়ন দেওয়ার মধ্য দিয়ে বাকি দুজন মনোনয়ন পাওয়া প্রার্থীদের শিবিরে চিন্তার ভাজ পড়েছে। 

মতামত দিন

বিজ্ঞপ্তি
সবার আগে সব খবর পেতে ভিজিট করুন - voiceofnarayanganj.com I যে কোন সংবাদ বা বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন - 01963958226 / 01819136738 অথবা মেইল করুন - voiceofnarayanganj24@gmail.com