যেসব স্পটগুলোতে টার্গেট করে ছিনতাইকারীরা
নারায়ণগঞ্জে ছিনতাইয়ের ঘটনা ক্রমশ ভয়ঙ্কর রূপ নিচ্ছে। রাত কিংবা ভোরে নিরিবিলি পরিবেশে জনমানবের উপস্থিতি দেখলেই ছিনতাইকারীরা টার্গেট করে হামলা করে ও সর্বস্ব ছিনিয়ে নেয়। এতে কেউ বাধা দিলেই দেশিয় বিভিন্ন অস্ত্র দিয়ে তার উপর আঘাত করে। এতে কেউ গুরুতর জখম হয় আবার কেউ প্রাণ হারায়। সর্বশেষ পুলিশের ওপর ছিনতাইকারীরা হামলা চালিয়ে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে পুলিশের সরকারী পিস্তল ছিনিয়ে নিয়ে যায়। এতে পুরো শহরে তোলপাড়া শুরু হয়। কারণ পুলিশ যেখানে জনগণকে নিরাপত্তা দেবে সেখানে পুলিশের নিরাপত্তা প্রশ্ন উঠছে এই ঘটনার মধ্য দিয়ে। ফলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ছিনতাইয়ের ঘটনার লাগাম টানতে বিভিন্ন স্পট চিহ্নিত করে প্রশাসনের যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে।
জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ শহরে ছিনতাইয়ের বেশ কিছু স্পটকে চিহ্নিত করা হয়েছে। সেগুলো হলো- চাষাঢ়া, বঙ্গবন্ধু সড়ককের বলাকা পাম্প, গলাচিপার মোড, উকিলপাড়ার সামনে বঙ্গবন্ধু সড়ক, নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের সামনে, গুলসান হলের রাস্তায়, কমির মার্কেট এলাকায়, ডিআইটি মসজিদের সামনে ও নিতাইগঞ্জে আশপাশের বিভিন্ন এলাকা, নয়ামাটির হোসিয়ারী পল্লীর পাশে অবস্থিত করিম মার্কেট, মাসদাইরের বোয়ালিয়া খাল, জামতলা ও চাষাঢ়া-পঞ্চবটী সড়কের ইসদাইর অক্টো অফিসের সামনে, দেওভোগ পানির ট্যাংকি, ১ নং বাবুরাইল, জিমখানা, জল্লারপাড়, পাইকপাড়া, বৌ-বাজার, নাগবাড়ি, বাপ্পি চত্ত¡র এবং শীতলক্ষ্যা নদী তীরের ওয়াকওয়েগুলোতে সবচেয়ে বেশি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। এছাড়া চাষাঢ়া থেকে দুই নম্বর রেল গেট, চাষাঢ়া থেকে পঞ্চবটী পর্যন্ত ঢাকা নারায়ণগঞ্জ পুরাতন সড়ক এবং ফতুল্লার কাশিপুর এলাকায় প্রায় প্রতিদিন ছিনতাইকারীদের কবলে পড়ছেন সাধারণ মানুষ।
একই অবস্থা নবাব সলিমুল্লাহ সড়কের কালিবাজার ১৬ তলার সামনে থেকে মেট্রোহল পর্যন্ত। সেখানে দলবদ্ধভাবে ছিনতাইকারীরা অবস্থান নেয়। তারা রিকশা ও ইজিবাই থামিয়ে যাত্রীদের ছুরি, রামদা ও চাপাতির ভয় দেখিয়ে সাথে থাকা মালামাল লুটে নেয়। ভুক্তভোগিরা সর্বস্ব হারিয়ে হতাশ হয়ে ফিরে যান। অনেকে থানায় গিয়ে অভিযোগও করেন।
বেশ কয়েকজন ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মধ্যরাত থেকে ভোর সকাল পর্যন্ত সড়কের আনাচে কানাচে সরব থাকেন ছিনতাইকারীদের চক্র। সুবিধাজনক স্থানে কাউকে দেখলেই টার্গেট করে সবকিছু নিয়ে নেন তারা। এ সময় কেউ তাদের সঙ্গে থাকা টাকা কিংবা মোবাইল এবং স্বর্ণালংকার দিতে রাজি না হলে ছুরিকাঘাত করা হয়। আর এ কারণে নারায়ণগঞ্জ দেড়শ শয্যা জেনারেল হাসপাতাল এবং ৩০০ শয্যা বিশেষায়িত হাসপাতালে ছিনতাইকারীদের আঘাতে আহত রোগীর উপস্থিতি দিনদিন বাড়ছে।
স্থানীয়রা বলছেন, রাতে পুলিশ এবং র্যাবের টহল বৃদ্ধি না করা হলে ছিনতাইয়ের ঘটনা কোনোভাবেই কমানো সম্ভব না। পাশাপাশি যারা এই অপরাধের সঙ্গে জড়িত তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।
গত ৯ মার্চ ভোরে নারায়ণগঞ্জ শহরের বঙ্গবন্ধু সড়কের নিতাইগঞ্জ এলাকায় নগর ভবনের সামনে ছিনতাইয়ের শিকার হয়েছেন লুৎফর রহমান নামে পুলিশের একজন দায়িত্বরত কর্মকর্তা। ছিনতাইকারীরা অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে তার সরকারি পিস্তল লুট করে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। আক্রান্ত লুৎফর রহমান নারায়ণগঞ্জ সদরের শীতলক্ষ্যা পুলিশ ফাঁড়ির সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই)।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ভোরে টহল টিমে বেশ কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা মন্ডলপাড়া ব্রিজের দিকে দায়িত্ব পালন করছিল। দায়িত্ব পালনকালে নারায়ণগঞ্জ সদরের শীতলক্ষ্যা পুলিশ ফাঁড়ির এএসআই লুৎফর রহমান টয়লেট ব্যবহারের জন্য টিম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। এ সময় তার সঙ্গে নিজের মোটরসাইকেল ছিল। পথে তিনজন ছিনতাইকারী তার পথরোধ করে এবং চাপাতি দিয়ে তাকে আঘাত করার চেষ্টা করে। তিনি সরে গেলে চাপাতি আঘাত থেকে বেঁচে যান। পরে তার সঙ্গে থাকা সরকারি পিস্তলটি লুট করে নিয়ে যায়। এ ঘটনার সময় তিনি পুলিশের পোশাকে ছিলেন।
এ ঘটনার পরে পুলিশ অভিযান চালিয়ে মিশাল ওরফে বিশাল নামে এক যুবককে গ্রেফতার করে। এছাড়া আরও বেশ কয়েকজনকে আটক করে। পরে বিশালের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশের ছিনতাই হওয়া অস্ত্র সহ গুলি উদ্ধার করা হয়।
এর আগে, গত ৮ মার্চ নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে ছিনতাইয়ের সময় জনতার হাতে ধরা পড়ে গণপিটুনিতে এক ছিনতাইকারী নিহতের ঘটনা ঘটেছে। এসময় তার অপর দুই সহযোগী পালিয়ে যায়। রোববার, ৮ মার্চ) ভোর সাড়ে ৬টার দিকে সিদ্ধিরগঞ্জ থানাধীন জালকুড়ি কড়ইতলা এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, তিনজন ছিনতাইকারী মোটরসাইকেলযোগে ওই এলাকায় ছিনতাইয়ের চেষ্টা করে। এসময় পথচারী ও স্থানীয় লোকজন তাদের ধাওয়া করলে এক ছিনতাইকারী ধরা পড়ে। পরে উত্তেজিত জনতা তাকে গণপিটুনি দিলে ঘটনাস্থলেই তিনি মারা যান।
গত ৮ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জের বন্দও ধামগড় এলাকায় অনলাইন বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে চাকরির আশ্বাস দিয়ে এক ব্যক্তিকে ডেকে এনে ছিনতাইয়ের চেষ্টা করা হয়েছে। এ সময় ভুক্তভোগীর চিৎকারে স্থানীয় লোকজন এগিয়ে এসে তিন যুবককে পিটুনি দেন।
আহত তিনজনকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি করা হয়েছে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে তাঁদের নাম-পরিচয় নিশ্চিত করতে পারেনি পুলিশ।
গত ২৩ অক্টোবর ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের নারায়ণগঞ্জ অংশে চলন্ত একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা ছিনতাইয়ের চেষ্টা এবং চালককে ছুরিকাঘাতের একটি ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। এ ঘটনায় ব্যাপক আলোচনা চলছে। কক্সবাজারগামী একটি গাড়ির যাত্রী নাজির উদ্দিন শাহ নিজের ফেসবুক আইডিতে ভিডিওটি পোস্ট করের ঘটনার বর্ণনা দেন।
২০২৪ সালের ১৪ ডিসেম্বর ভোরে নারায়ণগঞ্জ শহরের দেওভোগে আলী আহাম্মদ চুনকা পাঠাগারের সামনে ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের (এআইইউবি) শিক্ষার্থী মো. ওয়াজেদ সীমান্ত (২০) গুরুতর জখম হন। এ সময় তার কাছ থেকে মোবাইল ও এক হাজার ৮০০ টাকা নিয়ে যায় তারা। গুরুতর অবস্থায় প্রথমে নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতাল ও পরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে রাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
মতামত দিন