‘নিরপরাধ আইভী গাজী কারাগারে’
টানা তিন মেয়াদে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ও জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সিনিয়র সহ সভাপতি ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী ও নারায়ণগঞ্জ-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী দীর্ঘদিন ধরে কারাগারে রয়েছে। গাজী ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা। বৈষম্য বিরোধী ছাত্র হত্যার মামলা সহ আওয়ামী লীগের দলে থাকার অপরাধকে গুরু দÐ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ফলে আইনের মাপকাঠিতে তাদেরকে নির্দোষ দাবি করে আসছেন কারাগারে থাকা আইভী ও গাজীর স্বজনরা। সে হিসেবে তাদের দুজনকে আসন্ন ঈদুল ফিতরের ঈদ কারাগারে কাটাতে হবে।
এদিকে সাবেক মন্ত্রী ও নারায়ণগঞ্জ-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য গোলাম দস্তগীর গাজীর রূপগঞ্জের গাজী টায়ার কারখানা লুটপাট করে ও আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। এরপর মাসের পর মাস তাকে জেলে রাখা হয়েছে। অন্যদিকে সাবেক মেয়র আইভী গ্রেফতার হয়ে কারাগারে গেলেও তার বাড়িতে সেভাবে হামলা হয়নি। তবে আইভীকে গ্রেফতার করে আদালতে নেওয়ার সময় তার গাড়ি বহরে হামলা চালানো হয়।
তাদের স্বজনরা বলছেন, বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় গাজী ও আইভীর হামলা চালানোর বিষয়টি কাল্পনিক ও আবাস্তবিক মনে করছেন স্বজনরা। কারণ সাবেক মেয়র আইভী আন্দোলনের সময় কখনো মাঠে নামেননি। এছাড়া একজন নারী হয়ে তিনি কারও উপর হামলা করলে অন্তত পক্ষে তার কোন ভিডিও বা ছবি অবশ্যই প্রকাশ পেত। আর সাবেক মন্ত্রী গাজী বয়োজেষ্ঠ একজন ব্যক্তি। তার একা চলাফেরা করতে ভীষণ কষ্ঠ হয়। সে দিক বিবেচনায় কাউকে হামলা করা একেবারে অসম্ভব বিষয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজনীতিতে এক পক্ষ অপর পক্ষকে ঘায়েল করার জন্য বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মামলাগুলোকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। তবে এই চর্চা অব্যাহত থাকলে রাজনীতিক কালো অধ্যায়ের সমাপ্তি কখনো হবেনা।
জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী ২০০৮ সালে প্রথম প্রথমবার আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। পরে ধারাবাহিকভাবে ২০১৪ সালে দ্বিতীয়বার, ২০১৮ সালে তৃতীয়বার নির্বাচিত হন। ওই মেয়াদে তিনি বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সর্বশেষ ২০২৪ সালে চতুর্থ দফায় তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তবে ওই বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে রূপগঞ্জে অবস্থিত তার গাজী টায়ার কারখানায় আগুন দিয়ে লুটপাট করা হয়। এর কয়েকদিন পর গাজীকে গ্রেফতার করা হলে ফের তার গাজী টায়ার কারখানায় লুটপাট, ভাঙচুর সহ অগ্নিসংযোগ করা হয়। এ ঘটনায় ১৮২ জন নিখোঁজ সহ পুরো কারখানাটি পরিত্যাক্ত ঘোষণা করা হয়। এতে প্রায় ত্রিশ হাজারের অধিক শ্রমিক-কর্মচারী চাকরি হারান। এই ঘটনার পর থেকে গাজী পরিবারের সদস্যরা সবাই আত্মগোপনে রয়েছে। আর গোলাম দস্তগীর গাজী কারাগারে রয়েছে। তার বিরুদ্ধে বৈষমী বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের হত্যা মামলা সহ একাধিক হত্যা মামলার আসামি করা হয়েছে।
এদিকে ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী দীর্ঘ ২১ বছর পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের চেয়ারম্যান ও মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। জানা গেছে, ২০০৩ সালে অনুষ্ঠিত পৌর চেয়ারম্যান নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে জয়লাভ করে নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার প্রথম নারী চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন আইভী। পরে ২০১১ সালে নারয়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনে নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে তিনি মেয়র হিসেবে জয়লাভ করেন। ওই নির্বাচনে প্রভাবশালী শামীম ওসমানকে বিপুল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করে তিনি দুর্দান্ত দাপটে ছিলেন। পরে ২০১৬ সালে দ্বিতীয় ও ২০২২ সালে তৃতীয় দফায় নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলীয় নৌকা প্রতিক নিয়ে লড়াই করে জয়লাভ করেন ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। এছাড়া তিনি প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদাও পেয়েছিলেন। ফলে টানা তিন মেয়াদে সিটি করপোরেশনের মেয়র ও এক মেয়াদে পৌরসভার চেয়ারম্যান পদে আসিন থেকে দুর্দান্ত ক্ষমতাবান হয়ে উঠেন তিনি।
তবে ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে ওই বছরের ১৯ আগস্ট নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন সহ দেশের ১২টি সিটি করপোরেশনের মেয়রকে অপসারণ করে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়। এতে ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীকে মেয়র পদ থেকে অপসারণ করা হলে তিনি বাড়িতে অবস্থান করছিলেন।
২০২৫ সালের ৮ মে রাত সাড়ে ১১টার দিকে সাবেক এ মেয়রের বাড়ির সামনে অবস্থা নেয় পুলিশ। খবর পেয়ে বাড়ির বাইরে অবস্থা নেয় এলাকাবাসী। পরে সড়ক অবরোধ করে এলাকাবাসী বিক্ষোভ শুরু করে বাড়ির চারপাশে ঘিরে রাখে।এরপর বিপুল সংখ্যক পুলিশের একটি বহর সেলিনা হায়াৎ আইভীর বাড়িতে আসে। এসময় আশপাশের মসজিদগুলোতে পুলিশ আসার খবর ছড়িয়ে পড়লে শতশত মানুষ এসে কয়েকটি স্থানে ব্যারিকেড দিয়ে সড়ক অবরোধ করে। পরের দিন শুক্রবার ভোরে সাবেক মেয়র আইভীকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায় পুলিশ।
গ্রেপ্তারের সময় সেলিনা হায়াৎ আইভী সাংবাদিকদের বলেন, ‘পুলিশ গ্রেপ্তারি পরোয়ানা না দেখিয়ে তাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু বলা যদি অপরাধ হয়ে থাকে তাহলে আমি অপরাধী। কিন্তু নারায়ণগঞ্জে ২১ বছরের সেবায় কোনো দল কিংবা ব্যক্তিকে আঘাত করার মতো কিছু কখনো করিনি। যখনি নারায়ণগঞ্জে হত্যাকাÐ ঘটেছে তখনি প্রতিবাদ করেছি।’
এদিকে সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়ার সময় শহরের বি বি রোডের কালির বাজার এলাকায় দুর্বৃত্তরা পটকা ফুটিয়ে তাকে নিয়ে যাওয়া গাড়ির বহরে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে।
ওই দিন (৯ মে) বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সংঘটিত একটি হত্যা মামলায় গ্রেফতার দেখানোর পর থেকে প্রায় ১০ মাস ধরে আইভীকে গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগারে রাখা হয়। পরে আরও চারটি মামলায় শ্যোন অ্যারেস্ট দেখায় পুলিশ। পরে গত ৯ নভেম্বও সেই পাঁচটি মামলায় জামিন দেয় আদালত। এরপর ফের নতুন করে আরও পাঁচটি মামলায় তাকে শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানো হয়।
এ বিষয়ে সাবেক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর আইনজীবী আওলাদ হোসেন বলেন, আইভীর বিরুদ্ধে হত্যা সহ ১০টি মামলা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৫টি মামলায় তিনি জামিন পেয়েছেন। এসব মামলার এজাহারে বর্ণিত ঘটনার সাথে আইভী জড়িত না। তিনি (আইভী) নিরপরাধ। তবুও তিনি জেলে আছেন। শামীম ওসমান যেখানে যাবে সেখানে আইভী যাবেনা, এটা সবাই জানে। অথচ মামলাগুলোর বর্ণনায় তাদের দুজনের একস্থানে থাকার বিষয়টি বর্ণনায় উঠে এসেছে।
দলীয় সূত্র বলছে, নারায়ণগঞ্জে আইভী ও শামীম ওসমানের মধ্যে ছিল সাপে নেউলে সম্পর্ক। আইভী আওয়ামী লীগ দলীয় নেত্রী হয়েও নিজ দলের সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগ নেতা শামীম ওসমানের চরম বিরোধীতা করেছেন। এ নিয়ে দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিদেশের গণমাধ্যমেও তাদের তীব্র বিরোধীতার সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। মূলত আইভী সব সময় অন্যায় ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলায় গণমাধ্যমের বিশাল সাপোর্ট পেয়েছেন তিনি। আর আইভী বলয়ের সাথে শুরু থেকে যুক্ত ছিলেন সাবেক মন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী। ফলে তিনিও শামীম ওসমান বলয়ের চরম বিরোধীতা করেছেন। অথচ বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ঘটনার সময় প্রকাশ্যে শামীম ওসমান সহ তার অনুসারীদের অস্ত্র নিয়ে হামলার চালানোর ঘটনা বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। ফলে শামীম ওসমান ও তার অনুসারীদের পথ কখনো অনুসরণ করেনি আইভী ও গাজী। বরং তারা সব সময় শামীম ওসমানের উল্টো পথে হেঁেটছেন।
আইভী ও গাজীর স্বজনরা বলছেন, ‘বৈষম্য বিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের ঘটনায় তারা জড়িত নয়। তারা নিরপরাধ। কিন্তু আওয়ামী লীগের রাজনীতি করার দায়ে তাদের মিথ্যা মামলায় দোষারোপ করা হয়েছে। এগুলো নিছক রাজনীতিক মামলা বটে। রাজনীতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য তাদেরকে একের পর এক মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয়েছে।
মতামত দিন