ছেলে হত্যার আসামি অধরা, বিচার চেয়ে মায়ের মর্মান্তিক মৃত্যু
অপহরণের এক সপ্তাহ পর খোঁজ পাওয়া যায় ২১ বছর বয়সী মাহফুজুর রহমান শুভর মরদেহ। এ তরুণের হত্যার বিচারের দাবিতে সবচেয়ে বেশি যে মানুষটি সোচ্চার ছিলেন সেই মা মাকসুদা বেগমেরও মৃত্যু হয়েছে মর্মান্তিক এক দুর্ঘটনায়।গত শনিবার (২ মে) বিকেলে ফতুল্লার জালকুড়ি এলাকায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চাকার সঙ্গে ওড়না পেচিয়ে যাওয়ায় শ্বাসরোধে এ নারীর মৃত্যু হয় বলে জানিয়েছেন তার স্বামী মো. সোহেল।
তিনি বলেন, ওইদিন বিকেলে জালকুড়ির নিজেদের দোকান থেকে অটোরিকশায় পূর্ব ইসদাইর এলাকার বাড়িতে ফিরছিলেন। পথে এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। নিহত মাকসুদার মরদেহ দাফনও সম্পন্ন হয়েছে বলে জানান সোহেল।
“ছেলের মৃত্যু নিয়েই সারাক্ষণ টেনশনে থাকতো। কান্নাকাটি তো আর থামায়নি। কীসের থেকে কী হলো ছেলের মাও চলে গেলো। আমার ছেলে হত্যার আসামিদেরই তো পুলিশ ধরতে পারে নাই। আমাদের আর কোনো অভিযোগ নাই। যে বিচার চাওয়ার লাইগা সবচেয়ে বেশি জোর গলা ছিল, সেই তো গেছে গা”, কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলছিলেন সোহেল।
গত ২৯ মার্চ রাতে নিখোঁজ হন মাহফুজুর রহমান শুভ। শুভ আগে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্র মেরামতের কাজ করলেও পরে এলাকার কিছু বখাটে যুবকের সঙ্গে মাদক সেবনে আসক্ত হয়ে পড়েন। অপরাধ কর্মকাণ্ডেও জড়িয়ে পড়েছিলেন।
শুভর নিখোঁজ হবার দিন থেকেই তার পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করে আসছিলেন তাদের সন্তানকে অপহরণ করা হয়েছে। মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি সাখাওয়াত ইসলাম রানার সঙ্গে পূর্বের এক বিরোধের জেরে এই অপহরণের ঘটনাটি ঘটেছে।
পরে পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে ১ এপ্রিল ফতুল্লা মডেল থানায় ১১ জনের বিরুদ্ধে অপহরণের একটি মামলা রেকর্ড হয়। ওই মামলার প্রধান আসামি করা হয় স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা রানাকে এবং অন্য আসামিরাও তার সহযোগী। মামলার বাদী ছিলেন শুভর মা মাকসুদা বেগম (৩৯)।
রানা ২০০৫ সালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মারা যাওয়া যুবদলের সেই সময়ের ‘ক্যাডার’ মমিনউল্লাহ ডেভিডের ভাগনে।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, অপহরণের এক সপ্তাহ পর গত ৫ এপ্রিল রূপগঞ্জ থানায় গিয়ে শুভর মরদেহ শনাক্ত করেন তার পিতা-মাতা। কিন্তু ততদিনে মরদেহটি সরকারি একটি কবরস্থানে দাফনও করে ফেলেছিল পুলিশ।
ওই সময় রূপগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সালাহউদ্দিন বলেন, ৩০ এপ্রিল মরদেহটি রূপগঞ্জের কাঞ্চন ব্রিজ এলাকা থেকে অজ্ঞাত হিসেবে উদ্ধার করে পুলিশ। আঙুলের ছাপ নিয়ে একাধিকবার প্রযুক্তিগত সহায়তায় নিহতের পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলে রাজউকের কবরস্থানে সেটি দাফন করা হয়।
নিহতের শরীরের আঘাতের চিহ্ন থাকায় পুলিশ বাদী হয়ে রূপগঞ্জ থানায় একটি হত্যা মামলাও দায়ের করেছিল।
“পরে থানায় এসে নিহতের ছবি ও পরনের পোশাক দেখে সেটি শুভর বলে শনাক্ত করেন পরিবারের সদস্যরা”, জানিয়েছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা সালাহউদ্দিন।
মরদেহ শনাক্তের দিন রূপগঞ্জ থানার সামনে সন্তানের শোকে আহাজারি করতে করতে হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার দাবি করেছিলেন মাকসুদা বেগম। তিনি পুলিশের তদন্তে এবং আসামিদের ধরতে গড়িমসি করারও অভিযোগ করেছিলেন।
পুলিশ শুরুতেই গুরুত্ব দিয়ে ঘটনাটি তদন্ত করলে শুভকে জীবিত পাওয়া যেতো বলেও অভিযোগ ছিল নিহতের পরিবারের।
মামরার নথি ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, অপহরণের কয়েকদিন আগে একটি গ্যারেজের দখল নিয়ে স্বেচ্ছাসেবক দল রানার অনুসারীদের সঙ্গে শুভ ও তার বন্ধুদের বিরোধ হয়। ওই সময় ছুরি হাতে রানাকেও ধাওয়া করে শুভ। এ বিরোধের জেরেই শুভকে খুন হতে হয়েছে বলে অভিযোগ পরিবারের।
শুভ অপহরণ মামলায় অভিযোগ করা হয়, ২৯ মার্চ সন্ধ্যায় ইসদাইর রেললাইন এলাকা থেকে অপহরণের শিকার হয় বাদী মাকসুদার বড় ছেলে শুভ।
মারধরের পর শুভকে একটি ব্যাটারিচালিত ইজিবাইকে তোলা হয়। ওই ইজিবাইকের পেছনে পেছনে শুভর মোটরসাইকেলটিও চালিয়ে যান রানা। এরপর শুভ কিংবা তার মোটরসাইকেলটির সন্ধান পাওয়া যায়নি।
এ ঘটনার ১৫ থেকে ২০ দিন আগে চাষাঢ়া রেললাইন এলাকায় সাখাওয়াত ইসলাম রানার সঙ্গে তর্ক হয় শুভর। এরপর থেকে রানা ও তার সহযোগীরা শুভকে হত্যার হুমকি দিচ্ছিল বলে এজাহারে বলেন তার মা।
কিন্তু এই মামলার মাসখানেক পেরিয়ে গেলেও গ্রেপ্তার হননি প্রধান অভিযুক্ত মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি সাখাওয়াত ইসলাম রানা। যদিও মামলার পরও একাধিকবার তাকে প্রকাশ্যে ঘোরাফেরা করতে, এমনকি দলীয় অনুষ্ঠানেও উপস্থিত থাকতে দেখা গেছে। কিন্তু পুলিশের ভাষ্য, তিনি পলাতক রয়েছেন।
সরকারি দলের সহযোগী সংগঠনের নেতা হওয়াতে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করছে না বলেও অভিযোগ করেন নিহতের পিতা ঝুট ব্যবসায়ী মো. সোহেল। বিচারের আশায় থাকা মামলার বাদী শুভর মা মাকসুদাও দুর্ঘটনায় মারা যাওয়ায় পরিবারে শোক নেমে এসেছে। অন্যদিকে, বিচারের আশা আরও ক্ষীণ হয়েছে। ন্যায়বিচার নিয়ে তৈরি হয়েছে সন্দেহ।
মতামত দিন