জমি দখল ও বিচার সালিশ রবিউলের অন্যতম ব্যবসা!
নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার মুছাপুর ইউনিয়নসহ আশপাশের এলাকায় জমি দখল, প্রভাব বিস্তার এবং কথিত বিচার সালিশকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এক প্রভাবশালী চক্র নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এসব কর্মকাÐের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন নারায়ণগঞ্জ জেলা ছাত্র সমাজের সাধারণ সম্পাদক রবিউল আউয়াল। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে জমি দখল এবং সালিশের নামে অর্থ বাণিজ্য চালিয়ে আসছেন তিনি।
অভিযোগে বলা হয়, বিগত সময়ে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য নাসিম ওসমান-এর পরিবারের নাম ব্যবহার করে এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করেন রবিউল। বিশেষ করে জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য পারভিন ওসমান এবং তার ছেলে আজমেরী ওসমান এর নাম ভাঙিয়ে স্থানীয়দের ভয়ভীতি দেখানো হতো বলে দাবি করেছেন ভুক্তভোগীরা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, জমি সংক্রান্ত কোনো বিরোধ দেখা দিলেই সেখানে উপস্থিত হতেন রবিউল আউয়াল ও তার সহযোগীরা। প্রথমদিকে নিজেদেরকে ‘মধ্যস্থতাকারী’ হিসেবে উপস্থাপন করে উভয় পক্ষকে নিয়ে বসতেন তারা। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, এসব সালিশ কখনোই নিরপেক্ষ থাকতো না।
একাধিক ভুক্তভোগীর অভিযোগ, সালিশের নামে ডেকে নিয়ে একপক্ষকে চাপ প্রয়োগ করে অন্যপক্ষের পক্ষে রায় দেওয়া হতো। অনেক ক্ষেত্রে জমির প্রকৃত মালিকানা উপেক্ষা করে জোরপ‚র্বক দখল নিশ্চিত করা হয়েছে। এর বিনিময়ে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
মুছাপুর ইউনিয়নের এক ভুক্তভোগী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রথমে মনে হয়েছিল তারা সমস্যা সমাধান করতে এসেছে। কিন্তু পরে বুঝলাম, পুরো বিষয়টা ছিল সাজানো নাটক। আমাদের জমি অন্যের নামে দিয়ে দেওয়া হয়, আর আমরা প্রতিবাদ করলে হুমকি দেওয়া হয়।
অভিযোগের আরেকটি গুরুতর দিক হলো জমি দখলকে ‘ব্যবসা’ হিসেবে পরিচালনা করা। স্থানীয়দের দাবি, যেসব জমি নিয়ে বিরোধ বা দুর্বল মালিকানা রয়েছে সেসব জমিই টার্গেট করা হতো। এরপর বিভিন্ন কৌশলে জমির মালিকদের ভয় দেখিয়ে অথবা সালিশের মাধ্যমে জমি হাতিয়ে নেওয়া হতো।
অনেকেই অভিযোগ করেছেন, জমি রক্ষা করতে গেলে তাদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করা হতো। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে নানা ধরনের ভয়ভীতি, এমনকি হামলার শিকারও হতে হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এক স্থানীয় ব্যবসায়ী বলেন, এই চক্রের বিরুদ্ধে কথা বললেই বিপদ। তারা রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে সবকিছু চাপা দিয়ে রাখতো। অনেকেই ভয়ে মুখ খুলতে পারতো না।
স্থানীয়দের মতে, এসব কর্মকাÐ দীর্ঘদিন ধরে চললেও রাজনৈতিক ছত্রছায়ার কারণে কেউ সরাসরি প্রতিবাদ করতে সাহস পাননি। বিশেষ করে প্রভাবশালী পরিবারের নাম ব্যবহার করায় সাধারণ মানুষ ভীত হয়ে পড়তেন।
তবে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ঘনিষ্ঠ স‚ত্রগুলো বলছে, তাদের নাম ব্যবহার করা হলেও এসব কর্মকাÐের সঙ্গে তাদের সরাসরি কোনো সম্পৃক্ততা নেই। অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের জন্যই প্রভাবশালী নেতাদের নাম ব্যবহার করা হয়ে থাকে।
এমন পরিস্থিতিতে প্রশাসনের ভ‚মিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, এত অভিযোগ থাকা সত্তে¡ও দীর্ঘদিন কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এতে করে অভিযুক্তরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে।
বর্তমানে ওসমান পরিবার না থাকলেও রবিউল আউয়াল স্থানীয় বিএনপি নেতাদের সাথে আঁতাত করে চালিয়ে যাচ্ছে অপকর্ম। খোঁজ নিয়ে জানাযায়, স্থানীয় বিএনপি নেতাদের মোটা অংকের টাকা দিয়ে ম্যানেজ করে এখনও তিনি এলাকায় বহাল তবিয়তে তার ব্যবসা পরিচালনা করে যাচ্ছেন।
একজন সচেতন নাগরিক বলেন, প্রশাসন যদি শুরুতেই ব্যবস্থা নিত, তাহলে এই চক্র এত বড় হতে পারতো না। এখন বিষয়টি গভীরভাবে তদন্ত করা জরুরি।”
এই ধরনের জমি দখল ও সালিশ বাণিজ্যের কারণে এলাকায় সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। অনেক পরিবার তাদের পৈতৃক সম্পত্তি হারানোর আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছে। এছাড়া স্থানীয়দের মধ্যে আস্থার সংকটও তৈরি হয়েছে।
বিচার বহির্ভ‚ত সালিশ এবং রাজনৈতিক প্রভাবের অপব্যবহার সমাজে আইনের শাসনকে দুর্বল করে দেয়। এর ফলে সাধারণ মানুষ আইনি সহায়তার পরিবর্তে প্রভাবশালীদের দ্বারস্থ হতে বাধ্য হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে একটি বিপজ্জনক প্রবণতা তৈরি করে।
ভুক্তভোগীরা এখন এসব ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেছেন। তাদের মতে, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে যেন কেউ রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের সম্পত্তি দখল করতে না পারে, সে বিষয়েও ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
নারায়ণগঞ্জের বন্দর এলাকায় জমি দখল ও সালিশ বাণিজ্যের এই অভিযোগ নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। রবিউল আউয়ালকে ঘিরে ওঠা এসব অভিযোগ প্রমাণিত হলে তা শুধু একটি ব্যক্তির নয়, বরং পুরো এলাকার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্যই বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।
এসব বিষয়ে রবিউল আউয়ালের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি সকল বিষয় অস্বীকার করেন এবন সকল কিছু মিথ্যা বানোয়াট বলে দাবি করেন তিনি।
এখন দেখার বিষয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কতটা দ্রæত এবং কার্যকর পদক্ষেপ নেয়। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদঘাটিত হবে এবং দোষীরা দৃষ্টান্তম‚লক শাস্তির মুখোমুখি হবে।
মতামত দিন