অপহরণের ঘটনা আড়াল করতে জুয়েলের মিথ্যাচার
স্টাফ রিপোর্টার: নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় বিএনপি নেতা দেলোয়ার হোসেন দিলুকে (৬০) পুলিশ পরিচয়ে অস্ত্র ঠেকিয়ে অপহরণ করে নগদ তিন লাখ টাকা সহ ৫ লাখ টাকার চেক মুক্তিপণ বাবদ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে ফতুল্লা থানা কৃষকদলের সভাপতি জুয়েল আরমানের বিরুদ্ধে। এ ঘটনা আড়াল করতে জমি বায়নার মিথ্যাচার করে টালবাহানা করার চেষ্টা করছেন কৃষকদল নেতা জুয়েল আরমান। তবে এ মিথ্যাচারের বিষয়টি চ্যালেঞ্জ করেছেন ভুক্তভোগী বিএনপি নেতা দেলোয়ার হোসেন দিলু। এতে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, কৃষকদল নেতা জুয়েল আরমান শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা করছেন।
এই অপহরণের ঘটনায় সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জ চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ভুক্তভোগির ছেলে জুয়েল হাওলাদার বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেন।
আসামি জুয়েল আরমান হলেন ফতুল্লা থানা কৃষকদলের সভাপতি। ভুক্তভোগী দেলোয়ার হোসেন দিলু হলেন ফতুল্লা কুতুবপুর ইউনিয়ন বিএনপির সদস্য ও ব্যবসায়ী।
মামলা সূত্রে জানা গেছে, জুলাই আন্দোলনের পর থেকে জুয়েল আরমানের লোকজন নানা ভাবে ইঙ্গিত দিয়ে চাঁদা দাবি করে আসছিল। এর ধারাবাহিকতায় গত ২০ জুন ৪-৫ জন অস্ত্রধারী ব্যক্তি পুলিশ পরিচয়ে ব্যক্তি ফতুল্লার তক্কার মাঠ এলাকায় বিএনপি নেতা দেলোয়ার হোসেন দিলুর পথ রোধ করে মাইক্রোতে টেনে হেচড়ে তুলে ফতুল্লা থানায় নেওয়ার কথা বলে। তবে ফতুল্লা থানায় না নিয়ে তাকে থানার কাছাকাছি মাজার গলিতে গাড়ি রেখে নানা টালবাহানা করে ও ফতুল্লা থানার ওসির সাথে কথা বলার ভয়ভীতি দেখায়। এ সময় তারা ভয়ভীতি দেখিয়ে দেলুকে বলে, ‘কোন কথা বললে গুলি করে হত্যা করে ফেলবো।’ এর এক পর্যায়ে তারা দিলুকে ফতুল্লার ডিআইটি মাঠে আসামি জুয়েল আরমানের কাছে নিয়ে যায়। সেখানে জুয়েল আরমান তাকে উদ্দেশ্য করে বলে, ‘এদের দ্বারা তোকে আমি অপহরণ করে এনেছি। তোকে ১০ লাখ টাকার চাঁদা দিতে বলেছিলাম, কিন্তু তুই টাকা দিলিনা। এখন টাকা না দিলে জানে শেষ করে ফেলবো।’ এসব কথা বলে জুয়েল আরমান দিলুকে চড় মারে। এক পর্যায়ে বাধ্য হয়ে দিলু তার লোকজনদের ফোন করে নগদ তিন লাখ টাকা ও ৫ লাখ টাকার চেক নিয়ে আসতে বলে। পরে সেই টাকা ও চেক তাদের হাতে তুলে দেয়। মুক্তিপণের টাকা পেয়ে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ভুক্তভোগী দেলোয়ার হোসেন দিলু বলেন, সাদা পোশাকের পুলিশ পরিচয়ে একদল অস্ত্রধারীদের দিয়ে আমাকে অপহরণ করে নিয়ে যায় আসামি জুয়েল আরমান। আমাকে অপহরণ করা পুলিশের কাছে অস্ত্র, হ্যান্ডকাফ, ওয়ারলেস ছিল। তবে তারা আমাকে থানায় না নিয়ে জুয়েল আরমানের কাছে নিয়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে টাকা আদায় করে। এরপর থেকে তাদের অত্যাচারে আমি আর বাড়িতে থাকতে পারিনি। বিভিন্ন স্থানে পালিয়ে বেড়াচ্ছি। সবশেষ উপায় অন্ত না পেয়ে আদালতে গিয়ে মামলা করেছি।
তিনি আরও বলেন, আমার ব্যবসায় ঈর্ষান্বিত হয়ে ওরা আমার পিছু লেগেছে। জুলাই আন্দোলনের পর থেকে ওরা সুযোগ পেয়ে আমাকে বৈষম্যের মামলার আসামি করেছে। অথচ আমি বিএনপি নেতা হয়েও তাদের অত্যাচারে টিকতে পারছিনা। বৈষম্যের মামলার বিষয়ে আমি পুলিশ সুপারের কাছে দরখাস্ত দিয়েছি।
অভিযুক্ত ফতুল্লা থানা কৃষকদলের সভাপতি জুয়েল আরমান বলেন, অপহরণ নয়-জমি বিক্রির টাকা নিতে চাপ দিয়েছিলেন দিলুকে। বেকারীর গলিতে তার একটা জায়গা আছে, সেখান থেকে দুই শতাংশ জায়গা তিনি আমাকে দিবে বলে একটা দাম ধরা হয়েছিল। তবে সেই জমি না দিলে টাকার পরিবর্তে জমির হিসেব অনুযায়ী লভ্যাংশ দিবে আমাকে। তবে তিনি আমাকে না জানিয়ে জমিটি অন্যত্র বিক্রি করে ফেলেছে। এরপর দীর্ঘদিন আমি তাকে টাকা দেওয়ার জন্য চাপ দিতে থাকি। এরপর ওই দিন তিনি হাসিমুখে আমাকে নগদ টাকা ও চেক দিয়ে গেছেন।
বৈষম্য বিরোধী মামলার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমি তাকে মামলা দেইনি। মামলার বাদীকে আমি চিনিনা।
জুয়েল আরমানের মিথ্যাচারের বিষয়ে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে ভুক্তভোগী বিএনপি নেতা দেলোয়ার হোসেন দিলু বলেন, সে মূলত চাঁদাবাজ। সে পুলিশ গিয়ে আমাকে অপহরণ করে ভয়ভীতি দেখিয়ে আমার কাছ থেকে নগদ ও চেকে আমার কাছ থেকে ৮ লাখ টাকা নিয়েছে। অপহরণ মামলার মত জঘন্যতম অপরাধ ঢাকতে সে জমি বায়নার কথা বলে মিথ্যাচার করছে। তার সাথে জমি বেচা-কেনার কোন ঘটনা ঘটেনি। এই সংক্রান্ত কোন ডকুমেন্ট তিনি দেখাতে পারবেনা। এ বিষয়ে সে মিথ্যা কথা বলছে। আমি তার এই মিথ্যাচারের ওপেন চ্যালেঞ্জ করলাম।
তিনি আরও বলেন, কৃষক দলের নেতা থাকবে খেতে। কিন্তু সে থাকে শহরে। সে নাকি কৃষক দলের রাজনীতি করে। অথচ প্রকাশ্যে আমাকে অপহরণ করে চাঁদা আদায় করলো, এখনো তার বিচার পেলাম না।
এখানে উল্লেখ্য, বৈষম্য বিরোধী দুটি হত্যা মামলায় বিএনপি নেতা দেলোয়ার হোসেন দিলুকে আসামি করা হয়েছে। জানা গেছে, ২০২৪ সালের ২০ জুলাই বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডে গুলিবিদ্ধ হয়ে রাকিব নামে এক যুবক নিহত হয়। সেই ঘটনায় তার বাবা মোশারফ হোসেন বাদী হয়ে ফতুল্লা থানায় মামলা দয়ের করে। মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমানসহ ১৯৪ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা শতাধিক আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়। সেই আসামিদের তালিকায় কুতুবপুর ইউনিয়ন বিএনপি নেতা দেলোয়ার হোসেন দিলুর নাম রয়েছে।
একইভাবে বৈষম্য বিরোধী আরেকটি (পারভেজ) হত্যা মামলায় বিএনপি নেতা দেলোয়ার হোসেন দিলুকে আসামি করা হয়। সেই মামলার আসামি থেকে বিএনপি নেতা দিলুর নাম বাদ দেওয়ার জন্য জেলা পুলিশ সুপার বরাবর আবেদন করা হয়।
মতামত দিন