‘আইভী নিরপরাধ’ তবুও কারাগারে
টানা তিনবারের নির্বাচিত মেয়র ও একবারের পৌরচেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালনকারী নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ও জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সিনিয়র সহ সভাপতি ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী বৈষম্যবিরোধী হত্যা সহ একাধিক মামলায় তিনি দীর্ঘদিন ধরে কারাগারে রয়েছেন। অথচ তার আইনজীবী দাবি করেন, ‘সাবেক মেয়র আইভী নিরপরাধ। তিনি এসব ঘটনার সাথে জড়িত নয়।’
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আইভীর বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে রাজনৈতিক বানোয়াট মামলা দেওয়া হয়েছে- এটা পানির মত পরিষ্কার হলেও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের কারণে তা নিয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেনা।
জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সিটি করপোরেশনের মেয়র পদ বিলুপ্ত করার পর থেকে বাড়িতে অবস্থান করছিলেন সেলিনা হায়াৎ আইভী। ২০২৫ সালের ৮ মে রাত সাড়ে ১১টার দিকে সাবেক এ মেয়রের বাড়ির সামনে অবস্থা নেয় পুলিশ। খবর পেয়ে বাড়ির বাইরে অবস্থা নেয় এলাকাবাসী। পরে সড়ক অবরোধ করে এলাকাবাসী বিক্ষোভ শুরু করে বাড়ির চারপাশে ঘিরে রাখে।
এরপর বিপুল সংখ্যক পুলিশের একটি বহর সেলিনা হায়াৎ আইভীর বাড়িতে আসে। এসময় আশপাশের মসজিদগুলোতে পুলিশ আসার খবর ছড়িয়ে পড়লে শতশত মানুষ এসে কয়েকটি স্থানে ব্যারিকেড দিয়ে সড়ক অবরোধ করে। পরের দিন শুক্রবার ভোরে সাবেক মেয়র আইভীকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায় পুলিশ।
গ্রেপ্তারের সময় সেলিনা হায়াৎ আইভী সাংবাদিকদের বলেন, ‘পুলিশ গ্রেপ্তারি পরোয়ানা না দেখিয়ে তাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু বলা যদি অপরাধ হয়ে থাকে তাহলে আমি অপরাধী। কিন্তু নারায়ণগঞ্জে ২১ বছরের সেবায় কোনো দল কিংবা ব্যক্তিকে আঘাত করার মতো কিছু কখনো করিনি। যখনি নারায়ণগঞ্জে হত্যাকাÐ ঘটেছে তখনি প্রতিবাদ করেছি।’
এদিকে সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়ার সময় শহরের বি বি রোডের কালির বাজার এলাকায় দুর্বৃত্তরা পটকা ফুটিয়ে তাকে নিয়ে যাওয়া গাড়ির বহরে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে।
ওই দিন (৯ মে) বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সংঘটিত একটি হত্যা মামলায় গ্রেফতার দেখানোর পর থেকে প্রায় ১০ মাস ধরে আইভীকে গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগারে রাখা হয়। পরে আরও চারটি মামলায় শ্যোন অ্যারেস্ট দেখায় পুলিশ। গত ৯ নভেম্বর হাইকোর্টের বিচারপতি এ এস এম আবদুল মোবিন ও বিচারপতি মো. সগীর হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ আইভীকে পাঁচটি মামলায় জামিন দেন। এরপর ফের নতুন করে আরও পাঁচটি মামলায় তাকে শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানো হয়।
শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানো মামলাগুলো হলো- ফতুল্লায় জুলাই আন্দোলনের সময় বাসচালক আবুল হোসেন হত্যা মামলা, ইয়াছিন হত্যা মামলা, আব্দুর রহমান হত্যা মামলা ও পারভেজ হত্যা মামলা। অপর মামলাটি পুলিশের ওপর হামলা ও সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে করেছিল সদর মডেল থানা পুলিশ।
এ বিষয়ে সাবেক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর আইনজীবী আওলাদ হোসেন দেশকণ্ঠকে বলেন, সাবেক মেয়র আইভীর বিরুদ্ধে হত্যা সহ ১০টি মামলা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৫টি মামলায় তিনি জামিন পেয়েছেন। বাকি মামলাগুলোতেও তিনি সর্বোচ্চ আদলত থেকে জামিনে মুক্তি পাবেন বলে আশা করি।
তিনি আরও বলেন, মামলাগুলোর এজাহারে বর্ণিত ঘটনার সাথে আইভী জড়িত না। তিনি (আইভী) নিরপরাধ। তবুও তিনি জেলে আছেন। শামীম ওসমান যেখানে যাবে সেখানে আইভী যাবেনা, এটা সবাই জানে। অথচ মামলাগুলোর বর্ণনায় তাদের দুজনের একস্থানে থাকার বিষয়টি বর্ণনায় উঠে এসেছে।
ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী দীর্ঘ ২১ বছর পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের চেয়ারম্যান ও মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। জানা গেছে, ২০০৩ সালে অনুষ্ঠিত পৌর চেয়ারম্যান নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে জয়লাভ করে নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার প্রথম নারী চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন আইভী। পরে ২০১১ সালে নারয়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনে নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে তিনি মেয়র হিসেবে জয়লাভ করেন। ওই নির্বাচনে প্রভাবশালী শামীম ওসমানকে বিপুল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করে তিনি দুর্দান্ত দাপটে ছিলেন।
পরে ২০১৬ সালে দ্বিতীয় ও ২০২২ সালে তৃতীয় দফায় নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলীয় নৌকা প্রতিক নিয়ে লড়াই করে জয়লাভ করেন ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। এছাড়া তিনি প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদাও পেয়েছিলেন। ফলে টানা তিন মেয়াদে সিটি করপোরেশনের মেয়র ও এক মেয়াদে পৌরসভার চেয়ারম্যান পদে আসিন থেকে দুর্দান্ত ক্ষমতাবান হয়ে উঠেন তিনি। তার এক কথায় সিটি করপেরেশনের বড় বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো। এমনকি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গুডবুকে থাকার ফলে দুর্দান্ত দাপটের সাথে ক্ষমতার সংমিশ্রণে এক অপরাজেয় শক্তিতে পরিণত হন আইভী।
তবে ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে ওই বছরের ১৯ আগস্ট নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন সহ দেশের ১২টি সিটি করপোরেশনের মেয়রকে অপসারণ করে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়। এতে ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীকে মেয়র পদ থেকে অপসারণ করা হয় ও পরে তাকে জেলে পাঠানো হয়।
মতামত দিন