প্রধান খবর

প্রতিদিন কোটি টাকা উড়ে মাদক কারবারে

নারায়ণগঞ্জ জেলায় মাদক ব্যবসার সাথে পাঁচ শতাধিক ব্যক্তি জড়িত রয়েছে। তাদের মাধ্যমে মাদক বেঁচা কেনা হয়। তবে নেপথ্যে কারিগররা বরাবরের মতো ধরা ছোঁয়ার বাইরে থাকে। ফলে এসব মাদক ব্যবসায়ীরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হলেও পেছনের কারিগররা নানা কৌশলে আইনের ফাঁক-ফোকর দিয়ে তাদের ছাড়িয়ে নেয়। ফলে এসব মাদক ব্যবসায়ীরা আরও প্রশ্রয় পেয়ে বেপরোয়া হয়ে উঠে। আর এসব ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় কোটি টাকার উপরে মাদক দ্রব্য বেচা কেনা হয় বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, নারায়ণগঞ্জের ওপর দিয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক গেছে। তা ছাড়া ঢাকাসহ আশপাশের জেলাগুলোর সঙ্গে নারায়ণগঞ্জের সঙ্গে রয়েছে নৌ যোগাযোগ। সে কারণে ভারত সীমান্তবর্তী দুই জেলা কুমিল্লা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া হয়ে দেশে যেসব মাদক ঢুকছে, সেগুলো বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে দিতে এই জেলাকে ‘ট্রানজিট পয়েন্ট’ হিসেবে বেছে নিয়েছেন মাদক ব্যবসায়ীরা। কেবল তা-ই নয়, মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে আসা ইয়াবার চালানও এই জেলায় ঢুকছে।

একাধিক সূত্র বলছে, জেলার সাতটি থানা এলাকায় ৫২০ জন মাদক কারবারির তথ্য উঠে আসে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১৭৬ জন সদর থানা এলাকার। ফতুল্লা থানায় ১০৯ জন, সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় ৯৯ জন, বন্দর থানায় ৬০ জন, রূপগঞ্জ থানায় ৩৮ জন, আড়াইহাজার থানায় ২১ জন এবং সোনারগাঁও থানা এলাকার ১৭ জন মাদক কারবারির নাম রয়েছে তালিকায়। এখানে ক্ষমতাসীন দলের লোকজনই মাদক ও বিভিন্ন ক্ষেত্রে চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করেন।
একই সূত্র বলছে, এই জেলায় মাদক কেনাবেচার বড় স্পট বা স্থান রয়েছে ৩৫টি। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় স্পট রূপগঞ্জের চনপাড়া।

জানা গেছে, শুধুমাত্র রূপগঞ্জের চনপাড়া বস্তি এলাকাতেই প্রতিদিন ইয়াবার চাহিদা রয়েছে প্রায় ২০ হাজার পিসের মতো। পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জ শহর এখন যেন ইয়াবার শহরে পরিণত হয়েছে। শহর ও শহরতলীর যে কোনো পাড়া-মহল্লাতেই হাত বাড়ালেই মিলছে ইয়াবা।

শুধু নারায়ণগঞ্জ শহরের খানপুর, নগর খানপুর, তল্লা, জামতলা, দেওভোগ এলাকাতেই প্রতিদিন গড়ে কয়েক হাজার পিস ইয়াবা বিক্রি হচ্ছে বলে বিশ্বস্ত সূত্র জানিয়েছে। মাদকের এই নীল দংশনে ধ্বংস হচ্ছে জেলার কিশোর ও যুব সমাজসহ অনেক মেধাবী শিক্ষার্থীরা। এভাবে পুরো জেলায় প্রতিদিন প্রায় কোটি টাকার উপরে বিভিন্ন প্রকার মাদক বিক্রি হয়।

শর্টকাট ফর্মুলায় ধনী হওয়ার আশায় অনেক তরুণ ও নারীও এ পেশায় ঝুঁকছেন। মরণ নেশা গাঁজা, হেরোইন, ইয়াবা, ফেনসিডিল, আইসপিল, টিডিজেসিক ও লুপিজেসিক ইঞ্জেকশনসহ নানা ধরনের মাদকদ্রব্যে সয়লাব হয়ে গেছে পুরো জেলা। সদ্য অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে মাদকের স্পট নিয়ে বক্তব্য দিয়েছেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। নারায়ণগঞ্জ শহরের মাদক স্পট সম্পর্কে ধারণা দিয়ে তিনি এর বিরুদ্ধে অ্যাকশন নেওয়ার নির্দেশনা দেন।

তবে মাদকের কারবারিরা অনেক সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হলেও পৃষ্ঠপোষকরা থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মামলার তদন্তের দুর্বলতার কারণে মাদক কারবারের মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যান। মূলত মাদকসহ যাঁরা ধরা পড়েন, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তাঁদের অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। মাদকের উৎস, গন্তব্য এবং নেপথ্যে কারা যুক্ত, তা বেশির ভাগ মামলার তদন্তে উঠে আসে না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি নির্দিষ্ট সূত্র বলছে, পুলিশের তালিকায় মাদক কারবারের পৃষ্ঠপোষক ও আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতাদের নাম আসেনা।
এদিকে নারায়ণগঞ্জে রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচিত এমন অনেক ব্যক্তির নাম মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত রয়েছে। নারায়ণগঞ্জ মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক শাখাওয়াত ইসলাম এলাকায় মাদক কারবারি হিসেবে পরিচিত। স্থানীয় লোকজন জানিয়েছেন, শাখাওয়াতের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। তিনি মাদকসহ গ্রেপ্তারও হয়েছেন। তবে এ বিষয়ে শাখাওয়াতের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, ‘২০১৪ সালে একজন পরিচিত পরিবহন ব্যবসায়ীর গাড়িতে মাদক পাওয়া গেলে আমি তদবির করতে থানায় যাই। সেখানে একজন পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে আমার কথা-কাটাকাটি হয়। এর জেরে তিনি আমাকে মাদক মামলায় ফাঁসান।’
একাধিক সূত্র বলছে, ‘আমাদের দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির কারণে পুলিশের পক্ষে নিরপেক্ষ হয়ে কাজ করা সম্ভব হয় না। সেই কারণেই মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের অনেকের রাজনৈতিক পরিচয় উল্লেখ করা হয়নি। পৃষ্ঠপোষক অনেকের নাম আসেনি। ’
নারায়ণগঞ্জ নাগরিক কমিটির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রফিউর রাব্বি বলেন, ক্ষমতাসীন দলের লোকজনই মাদক ও বিভিন্ন ক্ষেত্রে চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করেন। পুলিশ মাদক বন্ধে আন্তরিক হলে কখনোই এটা চলতে পারে না। মাদক ধরা পড়লেও অনেক সময় মূল অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকেন। আবার অপরাধী ধরা পড়লেও এমন ধারায় মামলা দেওয়া হয়, যাতে সহজে তাঁরা জামিন পেয়ে যান। এ জন্য মাদক ব্যবসা বন্ধ হয় না।

মতামত দিন

বিজ্ঞপ্তি
সবার আগে সব খবর পেতে ভিজিট করুন - voiceofnarayanganj.com I যে কোন সংবাদ বা বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন - 01963958226 / 01819136738 অথবা মেইল করুন - voiceofnarayanganj24@gmail.com